তথাকথিত সমাজতন্ত্রের আড়ালে অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ (পর্ব-এক)
https://www.theguardian.com/cities/ng-interactive/2018/jul/30/what-china-belt-road-initiative-silk-road-explainer
পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের গাদার বন্দর এলাকাটি কয়েক বছর আগেও ছিল জেলেদের কিছু গ্রামের সমষ্টি। কিন্তু ৬২ বিলিয়ন ডলারের চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর প্রকল্পের আওতায় চীনের সহায়তায় দ্রুত এখানে নির্মিত হয় একটি গভীর সমুদ্র বন্দর। এই বন্দরের মাধ্যমে আরব সাগর থেকে কারাকোরাম মহাসড়ক হয়ে আরব সাগরের সাথে চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের সংযোগ ঘটেছে।
https://www.csis.org/analysis/pakistans-gwadar-port-new-naval-base-chinas-string-pearls-indo-pacific
উইঘুর মুসলিম অধ্যুষিত এই প্রদেশের বাণিজ্যের প্রসারের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞরা। চায়না ওভারসিজ পোর্ট হোল্ডিং কোম্পানি বন্দরটি নির্মাণ করে এবং নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় পাকিস্তান সরকার ২০১৭ সালে এই প্রতিষ্ঠানকে বন্দরটি ৪০ বছরের জন্য লিজ দেয়। হরমুজ প্রণালী এবং লোহিত সাগরের নিকটে গাদার বন্দরের অবস্থানের কারণে এই বন্দরের নিয়ন্ত্রণ পাওয়াকে চীনের আধিপত্য বিস্তারের ধাপ বলে দেখছে ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। একই কারণে গাদার বন্দর থেকে ১৭২ কিলোমিটার পশ্চিমে ইরানের চাবাহার এলাকায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ করছে ভারত।
২০১৭ সালের ডিসেম্বরে শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের হাম্বানটোটা বন্দর এবং বন্দর সংলগ্ন ১৫,০০০ একর জমি চীনের সরকারী প্রতিষ্ঠান চায়না হারবারকে ৯৯ বছরের জন্য লিজ দেয় শ্রীলঙ্কা সরকার। এলটিটিই গেরিলাদের দমন করতে গিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে মাহিন্দ্রা রাজাপাক্ষের শ্রীলঙ্কা সরকার যখন একঘরে হয়ে পড়ে, তখন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় চীন। রাজাপাক্ষের নিজের শহর হাম্বানটোটায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ প্রকল্পে অর্থ ঢালে চীন সরকার।
https://www.nytimes.com/2018/06/25/world/asia/china-sri-lanka-port.html
স্থানীয় বিশেষজ্ঞরা শুরু থেকে এই বন্দর নির্মাণের বিরোধিতা করে আসছিলেন, কেননা ইতোমধ্যে রাজধানী কলম্বোতে একটি গভীর সমুদ্র বন্দর রয়েছে এবং বন্দরটি সম্প্রসারণ করা সম্ভব। সম্প্রসারণের উদ্যোগ না নিয়ে ২য় একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ শ্রীলঙ্কার মতো একটি ছোট দেশের জন্য অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে না, এই হুঁশিয়ারিতে টলেনি রাজাপাক্ষের সরকার। চীনের রাষ্ট্রীয় ব্যাংক থেকে ৩০৭ মিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়ে ২০০৭ সালে শুরু হয় হাম্বানটোটা বন্দরের নির্মাণকাজ। ঋণের শর্ত হিসেবে বন্দর নির্মাণের কাজ পায় চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান চায়না হারবার এবং চীনা নির্মাণশ্রমিক এবং প্রকৌশলীদের আধিক্য থাকে প্রকল্পজুড়ে। প্রকল্পের চুক্তিস্বাক্ষরের সাথে জড়িত শ্রীলঙ্কান কূটনৈতিকদের মতে, শুরু থেকে চীনের অলিখিত শর্ত ছিল এই বন্দর ব্যবহারকারী সব জাহাজের এবং বন্দর পরিচালনার কার্যক্রমের তথ্য সংগ্রহ করবে চীন। এই বন্দরের কাজ পাইয়ে দেয়া রাষ্ট্রপতি মাহিন্দ্রা রাজাপাক্ষেকে ২০১৫ এর নির্বাচনে বিজয়ী করার জন্য অর্থ ঢালে চীন।
https://www.reuters.com/article/sri-lanka-china-submarine/chinese-submarine-docks-in-sri-lanka-despite-indian-concerns-idINKBN0IM0LU20141102
রাজাপাক্ষের নির্বাচনী প্রচারণা তহবিলে চায়না হারবার কোম্পানির অ্যাকাউন্ট থেকে অন্তত ৭৬ লাখ ডলার জমা হয়েছে বলে জানা যায় শ্রীলঙ্কা সরকারের অপ্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে। চীনের এই অর্থব্যয়ের মূল কারণ ছিল রাজাপাক্ষের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের নির্বাচনী ম্যান্ডেট, যেখানে শ্রীলঙ্কাকে চীন সরকারের ঋণের জাল থেকে মুক্ত করা ছিল একটি বড় ইস্যু। ২০০৭ সালে নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর ২০১০ সালে এসে তড়িঘড়ি করে উদ্বোধন করা হয় হাম্বানটোটা বন্দর। কিন্তু শুরু থেকে বন্দরটি জাহাজ আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হচ্ছিলো। ২০১২ সালে এসে শ্রীলঙ্কা সরকার বন্দরটি সম্প্রসারণের জন্য আবার চীনের কাছে ঋণ চায়, এবার চীন ৭৫৭ মিলিয়ন ডলার দেয় উচ্চ সুদে। চীনের এই ঋণ রাজাপাক্ষের নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। ২০১৫ সালের নির্বাচনে রাজাপাক্ষে পরাজিত হন। কিন্তু চীনের এই বিশাল ঋণ শোধের দায় নতুন সরকারের ঘাড়ে এসে পড়ে। আগের সরকারের রেখে যাওয়া ৪৪ বিলিয়ন ডলারের রাষ্ট্রীয় দেনা শোধ করতে গিয়ে আবারও চীন থেকে ১ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেয় শ্রীলঙ্কা সরকার। অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমানে শ্রীলঙ্কার কাছে চীনের পাওনা গিয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারে। ২০১৬ সাল থেকে শ্রীলঙ্কা সরকারের প্রতিনিধিরা চীন সরকারের সাথে আলোচনা শুরু করেন এই বিপুল দেন শোধ করার উপায় খুঁজতে, বিশেষ করে হাম্বানটোটা বন্দরের ব্যাপারে। কিন্তু চীন সরাসরি দাবি জানায় বন্দর নির্মাণের জন্য নেয়া ঋণ মওকুফের বদলে চীনকে লিখে দিতে হবে বন্দরটির সিংহভাগ অংশ। চায়না মার্চেন্ট পোর্ট বন্দর পরিচালনার কাজটি পায় এবং এবার তারা দাবি করে বন্দর সংলগ্ন আরও ১৫,০০০ একর জমি তাদের লিখে দিতে হবে, যেখানে নির্মিত হবে শিল্পাঞ্চল। দাবির স্বপক্ষে তাদের যুক্তি ছিল যে, এই বন্দরের জন্য নেয়া ১.১ বিলিয়ন ডলার ঋণ শোধ করার জন্য কেবল বন্দরের নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট নয়। শ্রীলঙ্কা সরকার দাবি মেনে নিয়ে ২০১৭ এর জুলাইতে চুক্তি স্বাক্ষর করে, চুক্তিটি কার্যকর হয় একই বছরের ডিসেম্বরে। এই বন্দরের মাধ্যমে চীন ভারতের উপকূলের মাত্র কয়েকশ কিলোমিটার দূরে নিজেদের রণতরী রাখার জায়গা নিশ্চিত করলো। ভারতের ক্রমাগত আপত্তির মুখে শ্রীলঙ্কা সরকার চীনের সাথে চুক্তিতে একটি ধারা যুক্ত করে, যেখানে বলা আছে শ্রীলঙ্কা সরকারের অনুমতি ব্যতীত বন্দরটি সামরিক কাজে ব্যবহার করা যাবে না। কলম্বো বন্দরে চায়না হারবার একটি নতুন টার্মিনাল নির্মাণ করেছে, যার অংশ হিসেবে ৫০ একর জমি পেয়েছে চৈনিক প্রতিষ্ঠানটি এবং যেখানে শ্রীলঙ্কার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ২০১৪ সালে জাপানী প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে যেদিন শ্রীলঙ্কা আসেন ঠিক সেদিনই কলম্বো বন্দরে ভেড়ে চীনের দু'টি যুদ্ধজাহাজ। ভারতের আশঙ্কা, দক্ষিণে হাম্বানটোটা এবং পশ্চিমে গাদার বন্দরে চীন স্থায়ী নৌবহর রাখার পরিকল্পনা করছে।
মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশের কিয়াকপিউ অঞ্চলে ৭.৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের জন্য চীন এবং মায়ানমারের মধ্যে সমঝোতা হলেও শেষ মুহূর্তে প্রকল্প থেকে পিছিয়ে গিয়েছিল মায়ানমার। নির্মাণ ব্যয়কে অতিরিক্ত উল্লেখ করে মায়ানমার সরকার সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চীনের ঋণের ফাঁদে আটকা পড়তে হবে এই আশংকায় মায়ানমার শেষ মুহূর্তে অবস্থান পরিবর্তন করে। আলোচনার মাধ্যমে প্রকল্পের ব্যয় ৬ বিলিয়ন ডলার কমিয়ে আনা হয়েছে ১.৩ বিলিয়নে।
https://www.reuters.com/article/us-myanmar-china-port-exclusive/exclusive-myanmar-scales-back-chinese-backed-port-project-due-to-debt-fears-official-idUSKBN1KN106
এছাড়া বন্দরটিতে চীনের অংশীদারিত্ব নামিয়ে আনা হয়েছে ৭০ শতাংশে।
https://www.globaltimes.cn/content/1125585.shtml
বাংলাদেশের সোনাদিয়াতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছিল চীন।
https://m.bdnews24.com/en/detail/business/1448195
কিন্তু প্রকল্পটি আর এগোয়নি। হাম্বানটোটা বন্দর নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান চায়না হারবার কোম্পানিকে সরকারী কর্মকর্তাদের ঘুষ সাধার দায়ে ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে বাংলাদেশ সরকার।
...............................................................................................
কিরগিজস্তানের পূর্বদিকে চীনের জিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। চীনের সঙ্গে কিরগিজস্তানের সীমান্তের দৈর্ঘ্য ১,০৬৩ কি.মি.। অর্থনীতির মাধ্যমে চীন কিরগিজস্তান এবং সমগ্র মধ্য এশিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী। এই উদ্দেশ্যে চীন কিরগিজস্তানের অর্থনীতিকে চীনের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলতে বহুলাংশে সফল হয়েছে। কারণ বেইজিং ভালো করেই জানে, একটি রাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারলে রাষ্ট্রটির রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের হাতে চলে আসবে। কিরগিজস্তানের অর্থনীতি ক্রমশ চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। চীন কিরগিজস্তানের আমদানির বৃহত্তম উৎস এবং কিরগিজস্তানের মোট আমদানির প্রায় ৩৩.৪% আসে চীন থেকে। এর বিপরীতে চীন কিরগিজস্তান থেকে খুব কম পণ্য আমদানি করে; কিরগিজস্তান যেসব রাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানি করে সেই তালিকায় চীনের অবস্থান শীর্ষ পাঁচের মধ্যে নেই। কিরগিজস্তানের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৮.১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার ৪১% চীন থেকে নেয়া। কিরগিজস্তানের মোট জাতীয় উৎপাদনের পরিমাণই ৮.২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার! চীনের ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট ব্যাঙ্কের কাছে ২০০৯ সালে কিরগিজস্তানের ঋণের পরিমাণ ছিল ৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, আর পরবর্তী ১০ বছরে এই ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে! চীন যেভাবে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও কেনিয়াকে ঋণের ফাঁদে আটকে ফেলেছে, কিরগিজস্তানকে একইভাবে ঋণের ফাঁদে ফেলবে এবং অন্যায় সুবিধা আদায় করে নেবে। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কিরগিজস্তান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিআরআই প্রকল্পে যে ৬টি করিডোর সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তার একটি হচ্ছে চীন-মধ্য এশিয়া-পশ্চিম এশিয়া করিডোর, যেটি চীনকে সড়ক ও রেলপথে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করবে।
https://foreignpolicy.com/2019/03/31/963451-kyrgyz-xinjiang-students-camps/
করিডোরটি কিরগিজস্তানসহ মধ্য এশিয়ার প্রাক্তন সোভিয়েত রাষ্ট্রগুলোর মধ্য দিয়ে ইরান হয়ে তুরস্কে গিয়ে শেষ হবে। বিআরআই প্রকল্পের অংশ হিসেবে চীন কিরগিজস্তানে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করেছে এবং বর্তমানে কিরগিজস্তানে শীর্ষ বিনিয়োগকারী রাষ্ট্র হচ্ছে চীন। কিরগিজস্তানের বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়ন প্রকল্পে চীন এ পর্যন্ত বিনিয়োগ করেছে প্রায় ২.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা কিরগিজস্তানের বাৎসরিক বাজেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। কিরগিজস্তানের অবকাঠামো খাতে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করলেও চীনা প্রযুক্তি ও লোকবল ব্যবহার করে নির্মিত অবকাঠামোর গুণগত মান নিম্ন।
https://www.nytimes.com/2019/07/06/world/asia/china-russia-central-asia.html
২০১৩ সালে বিশকেক শহরের সোভিয়েত আমলে নির্মিত বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সংস্কার করার জরুরি প্রয়োজন দেখা দেয়। রুশ কোম্পানি ইন্তের আরএও এবং চীনা কোম্পানি টিবিইএ উভয়ে কাজটি পাওয়ার প্রচেষ্টা চালায়।
https://www.interrao.ru/en/
রুশ কোম্পানিটি বিশকেকে একটি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব দেয় এবং এজন্য ৫১৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন বলে জানায়। অন্যদিকে চীনা কোম্পানিটি ৩৮৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পুরাতন বিদ্যুৎকেন্দ্রটির সংস্কার করে দেবে বলে জানায়।
https://en.m.wikipedia.org/wiki/TBEA#Construction_engineering
চীনা কোম্পানিটি তুলনামূলক সস্তায় কাজটি করে দেবে বলে কিছু কিরগিজ বিশেষজ্ঞ কাজটি চীনা কোম্পানিকে দেয়ার প্রস্তাব করেন। চীনা কোম্পানিটির বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও রুশ কোম্পানিটি এই কাজে অভিজ্ঞ বিধায় অন্য একদল কিরগিজ বিশেষজ্ঞ কাজটি রুশ কোম্পানিটিকে দিতে চেয়েছিলেন।
https://thediplomat.com/2019/10/why-is-anti-chinese-sentiment-on-the-rise-in-central-asia/
কিন্তু চীনা সরকারের প্রবল চাপের মুখে বিশকেক এই কাজটি চীনা কোম্পানিটিকে দিতে বাধ্য হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্র সংস্কারের জন্য যে ৩৮ কোটি ৬০ লক্ষ মার্কিন ডলারের প্রয়োজন, সেটি কিরগিজস্তানকে চীন থেকে ঋণ নিতে হয়, সুদসহ যার পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার! সংস্কারের এক বছরের মাথায় ২০১৮ সালে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি অচল হয়ে পড়ে এবং শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম তাপমাত্রার মধ্যে বিশকেক শহরের অধিবাসীরা বিদ্যুৎ ও তাপবিহীন হয়ে পড়ে। অথচ রুশ কোম্পানিটি বিশকেকে নতুন একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করে দিতে চেয়েছিল। কিরগিজস্তানকে ঋণ দেয়ার পরিবর্তে তারা নিজেদের অর্থে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি তৈরি করতে চেয়েছিল, বিনিময়ে তারা চেয়েছিল বিদ্যুৎকেন্দ্রটির আংশিক মালিকানা ও বছরপ্রতি বিদ্যুৎকেন্দ্রটি থেকে প্রাপ্য রাজস্বের অংশবিশেষ। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি অচল হয়ে পড়ার পর কিরগিজস্তানের সরকার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী সাপার ইসাকভসহ বেশ কিছু সরকারি কর্মকর্তাকে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করে।
https://en.m.wikipedia.org/wiki/Sapar_Isakov
ইসাকভের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি চীনা সরকারের চাপে কোম্পানিটিকে কাজটি দিতে বাধ্য হয়েছিলেন! কিরগিজস্তানে চীন যেসব প্রকল্প নিয়েছে, সেই প্রকল্পগুলোতে স্থানীয় কিরগিজদের কাজ না দিয়ে চীনাদের নিয়োগ দেয়া হচ্ছে।
https://www.rferl.org/amp/kyrgyz-authorities-cancel-chinese-investment-project-amid-protests/30441324.html
কিরগিজস্তানে বিভিন্ন চীনা প্রকল্পে কাজের জন্য এবং অন্যান্য কারণে বহু সংখ্যক চীনা নাগরিক বসতি স্থাপন করছে। ২০১৮ সালে প্রায় ৩০ হাজার চীনা কিরগিজস্তানে এসেছে। এদের মধ্যে অনেকে স্থানীয় কিরগিজ মেয়েদের বিয়ে করছে। চীনা সরকার কিরগিজস্তানে বেশ কয়েকটি 'কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট' স্থাপন করেছে, যার উদ্দেশ্য কিরগিজদের মধ্যে চীনপন্থী মনোভাব সৃষ্টি করা।
https://en.m.wikipedia.org/wiki/Confucius_Institute
২০১৯ সালের ১ অক্টোবর কিরগিজস্তানের বিভিন্ন শহরে চীনারা তাদের জাতীয় দিবস সাড়ম্বরে উদযাপন করেছে। কিরগিজস্তানের সঙ্গে চীনের সীমান্ত সমস্যা ছিল। কিরগিজস্তান যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিল, তখন কিরগিজস্তানের ভূমি দখল করার সাহস চীনের ছিল না। কিন্তু স্বাধীন কিরগিজস্তানের সামরিক বাহিনী দুর্বল হওয়ার কারণে ১৯৯০ এর দশকে কিরগিজস্তান চীনের নিকট সীমান্তবর্তী ১,২৫০ কি.মি. ভূমি হস্তান্তর করতে বাধ্য হয়। চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলে প্রায় ২ লক্ষ কিরগিজ বসবাস করে এবং এদের সঙ্গে কিরগিজস্তানের কিরগিজদের আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। চীন ২০১৭ সাল থেকে জিনজিয়াং অঞ্চলের যেসব মুসলিমকে পুন:শিক্ষা কেন্দ্রগুলোতে বন্দি করে রেখেছে, তাদের মধ্যে কমপক্ষে ২২ হাজার কিরগিজ রয়েছে। অধিকাংশই চীনের নাগরিক হলেও এদের মধ্যে বেশ কিছু কিরগিজস্তানের নাগরিক ছিল। কিরগিজস্তানের জনসাধারণ এজন্য চীনবিরোধী প্রতিবাদ মিছিল করে। যদিও কিরগিজস্তানের সরকার জিনজিয়াং ইস্যুতে মৌনতা অবলম্বন করতে বাধ্য হয়েছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে কিরগিজস্তানের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি সুরুনবে জিনবেকভ জানান, তারা কূটনীতির মাধ্যমে বন্দি কিরগিজ নাগরিকদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন এবং চীনের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে তারা অপারগ।
https://en.m.wikipedia.org/wiki/Sooronbay_Jeenbekov
২০১৮ সালের জুনে কিরগিজস্তান চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে 'ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারিত্বে'র পর্যায়ে উন্নীত করেছে। এর ফলে কিরগিজস্তান ও চীনের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং চীনা সৈন্যরা কিরগিজস্তানের মাটিতে কিরগিজ সৈন্যদের সঙ্গে সামরিক মহড়া করেছে।
http://www.xinhuanet.com/english/2019-06/13/c_138141034.htm
কিরগিজদের জাতীয় মহাকাব্য 'মানাসের মহাকাব্যে' কিরগিজ মহাবীর মানাস যেসব শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল, তাদের একটি হলো চীন। 'মানাস মহাকাব্য' বিশ্বের ৩য় বৃহত্তম মহাকাব্য।
https://en.m.wikipedia.org/wiki/Epic_of_Manas
চীনের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখতে বিশকেক মস্কোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। কিরগিজস্তান মস্কো নিয়ন্ত্রিত 'স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের কমনওয়েলথ', 'ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়ন' এবং 'যৌথ নিরাপত্তা চুক্তি সংস্থা'র সদস্য।
https://en.m.wikipedia.org/wiki/Commonwealth_of_Independent_States
https://en.m.wikipedia.org/wiki/Eurasian_Economic_Union
https://en.m.wikipedia.org/wiki/Collective_Security_Treaty_Organization
২০১৯ সালের জানুয়ারিতে কিরগিজস্তানের বিভিন্ন শহরে চীনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিল বের হয়। কিরগিজরা চীনাদের কিরগিজস্তানের কাজ করার অনুমতিপত্র প্রদান বন্ধ, চীনের নিকট কিরগিজস্তানের ঋণ হ্রাস এবং কিরগিজ মেয়েদের সঙ্গে চীনাদের বিয়ে নিষিদ্ধ করার দাবি জানায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কিরগিজ পুলিশ বহুসংখ্যক বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে কিরগিজস্তানের পূর্বাঞ্চলের নারিন শহরে চীন ২৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে একটি সরবরাহ কেন্দ্র নির্মাণের প্রকল্প নিলেও স্থানীয় অধিবাসীদের প্রতিবাদের কারণে সরকার প্রকল্পটি বাতিল করতে বাধ্য হয়।

Comments