অভিজিৎ এর ভক্তদের প্রতি (পর্ব-তিন)
ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন-
"যেখানে বিভিন্ন ধর্মের লোক বাস করে, সেখানে এরকম দাঙ্গা হয়েই থাকে।"
[ভয়েস অব আমেরিকা, ২২-৫-১৯৮৪]
তার সময়ে সংগঠিত হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সময় তিনি সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছিলেন ভারতের গণতান্ত্রিক সংবিধান অনুযায়ী নাকি সাম্প্রদায়িক দলগুলোকে বেআইনি ঘোষণা করা যায় না! ইন্দিরার দলীয় কর্মীরা মোরারজি দেসাই প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন আসামের বাঙালিদের উস্কে দিয়েছিল দাঙ্গার সময়, আবার ক্ষমতায় এসে এরা উল্টো আচরণ করেছে ঐ অঞ্চলের বাঙালিদের সাথে।
অভিজিৎ রায় তার এক বইয়ে উগ্র হিন্দুদের দ্বারা শিখ নিধনকে ধর্মের কারণে মানুষ হত্যার তালিকায় ঢুকিয়ে গেছেন! অথচ শিখদের সরকারের সাথে বিরোধ ধর্মীয় কারণে ছিল না। তাদের দাবিগুলোর একটি খসড়া ইন্দিরা গান্ধীর কাছে পেশ করা হয়েছিল।
দাবিগুলো ছিল-
১) রাভি ও বিয়াস নদীর পানি পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও রাজস্থানের মধ্যে ন্যায়ভাবে বন্টনের জন্য সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতিকে দায়িত্ব দিতে হবে যার সিদ্ধান্ত সবাই মেনে নিতে বাধ্য থাকবে।
২) একটি এলাকা নির্ধারণ কমিশন গঠন করে হরিয়ানার পাঞ্জাবীভাষীদের এলাকা পাঞ্জাবের সাথে এবং পাঞ্জাবের হিন্দিভাষীদের এলাকা হরিয়ানার সাথে যুক্ত করতে হবে।
৩) আনন্দপুর সাহেবের কমিশনের প্রস্তাব বিবেচনা।
https://en.m.wikipedia.org/wiki/Anandpur_Sahib_Resolution
৪) চন্ডীগড়কে পাঞ্জাবের রাজধানী করা এবং পাঞ্জাব থেকে জায়গা নিয়ে হরিয়ানার জন্য একটি রাজধানী নির্মাণ ইত্যাদি।
দাবিগুলো আদায়ের অগ্রগতি জানতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নরসিমা রাও এর কাছে চিঠি লেখা হয়, ২৫ মে শিখ নেতারা আরও একটি স্বারকপত্র লিখেন এই ব্যাপারে। অথচ কোনো জবাব না দিয়ে ৩রা জুন স্বর্ণমন্দিরে আক্রমণ করা হলো হিন্দুদের ভোট বাড়াতে নির্বাচনের আগে। সেনাবাহিনী কর্তৃক আক্রমণের সময় হরচাঁদ সিং লংওয়াল ফোনে ইন্দিরার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও আগে থেকে তার টেলিফোনের লাইন কেটে রাখা হয়েছিল। অথচ বিজেপি সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় ইন্দিরার কংগ্রেস শিখদের মদদ দিয়েছিল।
https://en.m.wikipedia.org/wiki/Harchand_Singh_Longowal
..........................................................................................
মহান বলশেভিক বিপ্লব ও স্তালিনের শুদ্ধি অভিযানকে 'ইহুদি গণহত্যা' হিসেবে দেখিয়ে গেছেন পশ্চিমাদের নুন খাওয়া এই মুক্তমনা!
স্তালিন ইহুদি বসতি স্থাপনের জন্য সাইবেরিয়ায় 'জিউশ অটোনমাস অবলাস্ট' নামে স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল বরাদ্দ দিয়েছিলেন। ১৯৪৮ সালের ১৭ মে ইজরায়েলকে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। ইহুদিরা যখন সন্ত্রাসীদের সারা পৃথিবী থেকে জোগাড় করে বিভিন্ন সংগঠন বানিয়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাতে আরম্ভ করে, তখন স্তালিন ইজরায়েলের বিরুদ্ধে আরবদের ব্যাপকভাবে সহায়তা করেছিলেন। লিয়ন ট্রটস্কি, গ্রিগরি জিনোভিয়েভ, লেভ কামেনেভসহ পার্টির আরো অনেকে ইহুদি বংশোদ্ভূত ছিল যাদের গ্রেট পার্যের সময় বিচার হয়। ১৯৩৯ সালের ৩ মে স্তালিন ইহুদি বংশোদ্ভূত পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাক্সিম লিটভিনভকে পদচ্যুত করেন। এদের কি কি কর্মকান্ডের কারণে বিচার হয়েছে সেটা না বলে স্তালিনকে 'ইহুদি বিদ্বেষী' বানিয়ে দেয়ার চেষ্টা হাস্যকর। নাৎসিরা যখন সোভিয়েত ভূখণ্ড আক্রমণ করে তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের ইহুদি বুদ্ধিজীবীরা 'জিউশ এন্টি-ফেসিস্ট কমিটি' (JAC) গঠন করে। সংগঠনটির জায়নিজমকে ব্যাপক সমর্থন, ইজরায়েলের প্রতি আকর্ষণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকার ফলে স্তালিন এই সংগঠনের সাথে জড়িতদের উপর নজরদারি শুরু করেন।
স্তালিন ইহুদি বসতি স্থাপনের জন্য সাইবেরিয়ায় 'জিউশ অটোনমাস অবলাস্ট' নামে স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল বরাদ্দ দিয়েছিলেন। ১৯৪৮ সালের ১৭ মে ইজরায়েলকে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। ইহুদিরা যখন সন্ত্রাসীদের সারা পৃথিবী থেকে জোগাড় করে বিভিন্ন সংগঠন বানিয়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাতে আরম্ভ করে, তখন স্তালিন ইজরায়েলের বিরুদ্ধে আরবদের ব্যাপকভাবে সহায়তা করেছিলেন। লিয়ন ট্রটস্কি, গ্রিগরি জিনোভিয়েভ, লেভ কামেনেভসহ পার্টির আরো অনেকে ইহুদি বংশোদ্ভূত ছিল যাদের গ্রেট পার্যের সময় বিচার হয়। ১৯৩৯ সালের ৩ মে স্তালিন ইহুদি বংশোদ্ভূত পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাক্সিম লিটভিনভকে পদচ্যুত করেন। এদের কি কি কর্মকান্ডের কারণে বিচার হয়েছে সেটা না বলে স্তালিনকে 'ইহুদি বিদ্বেষী' বানিয়ে দেয়ার চেষ্টা হাস্যকর। নাৎসিরা যখন সোভিয়েত ভূখণ্ড আক্রমণ করে তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের ইহুদি বুদ্ধিজীবীরা 'জিউশ এন্টি-ফেসিস্ট কমিটি' (JAC) গঠন করে। সংগঠনটির জায়নিজমকে ব্যাপক সমর্থন, ইজরায়েলের প্রতি আকর্ষণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকার ফলে স্তালিন এই সংগঠনের সাথে জড়িতদের উপর নজরদারি শুরু করেন।
https://en.m.wikipedia.org/wiki/Jewish_Anti-Fascist_Committee
স্তালিনের যেসব কর্মকাণ্ডকে 'ইহুদি বিদ্বেষ' হিসেবে প্রচার করা হয় সেখানেও তার সহযোগীদের অনেকে ইহুদি পরিবার থেকে আগত ছিল। ১৯৫৩ সালে 'ডেইলি মেইল' পত্রিকায় লেখা হয় স্তালিন নাকি সোভিয়েত ইউনিয়নে কমপক্ষে দুই কোটি ইহুদি হত্যা করতে চেয়েছিলেন! শেষ পর্যন্ত নাকি ৬০ লক্ষ ইহুদি হত্যা করেছিলেন! সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদি জনসংখ্যা ছিল ৫৬ লাখের কাছাকাছি। ১৯৪১ সালে জার্মানি কর্তৃক সোভিয়েত আক্রমণের সময় প্রায় ২৫ লক্ষ ইহুদি নিহত হয়, আরও ২০ লক্ষ নিহত হয় ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত। তারপরও ১৯৫৯-১৯৮৯ পর্যন্ত সোভিয়েতে ইহুদি জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৯ লক্ষ।
জেলেনস্কি ইহুদি, আবার মার্ক্সও ইহুদি পরিবার থেকে আগত। অপরদিকে আনা ফ্রাঙ্ক ইহুদি ছিলেন, আবার নেতানিয়াহু ইহুদি। প্রাসঙ্গিকভাবেই এক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয় এসেছে। ইজরায়েল কর্তৃক ফিলিস্তিনে চালানো প্রতিটা আগ্রাসনের সময় মূল ইজরায়েল ছাড়াও সারা বিশ্ব থেকে অসংখ্য আগ্রাসন বিরোধী ইহুদী প্রতিবাদ দেখায়। এক্ষেত্রে ভারতের আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতির বিরোধিতা করার সময় মুক্তমনা নামক ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চারা বাম দলগুলোকে 'ভারতবিরোধী' হিসেবে প্রচার করে, সাধারণ মানুষকে মোল্লা হিসেবে দেখায় (যেহেতু অধিকাংশ অধিবাসী মুসলিম)! ফেলানী হত্যার জন্য কিন্তু বাংলাদেশ নয়, পশ্চিমবঙ্গের এক সংস্থা সবার আগে বিএসএফ এর বিরুদ্ধে মামলা করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতা ভার্সিটির শিক্ষার্থীরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে চাঁদা তুলে বাংলাদেশিদের খাইয়েছে (তাদের সরকারের উদ্দেশ্য অন্য কিছু থাকলেও)। মুম্বাই বন্দরের শ্রমিকরা নিজেদের বেতনের টাকা পাঠিয়ে দিয়েছে, সাধারণ মানুষের সাহায্যের পরিমাণ অনেক বেশি। মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। ছবির লোকটির নাম ইয়র কলোময়স্কি। জেলেনস্কির সিরিজটি প্রচারিত হতো কলোময়স্কির মালিকানাধীন একটি টিভি চ্যানেলেই এবং ঐ চ্যানেল ও প্রোডাকশনের লোকজনই প্রথম জেলেনস্কির পক্ষে রাজনৈতিক দল গঠন করেছিল। কলোময়স্কি অনেক আগে থেকেই প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট পরোশেঙ্কোর প্রতিদ্বন্দ্বী। কলোময়স্কি জেলেনস্কির খ্যাতিকে কাজে লাগিয়েই পরোশেঙ্কোকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে এবং জেলেনস্কির সরকারে পেছন থেকে কলকাঠিও তিনিই নাড়ছেন। ইউক্রেনের সরকার কর্তৃক দ্বৈত নাগরিকত্ব নিষিদ্ধ হলেও এই লোক সংবিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ইউক্রেন, সাইপ্রাস আর ইজরায়েলের নাগরিক বর্তমানে! এই লোক 'সেন্ট্রাল ইউরোপিয়ান মিডিয়া এন্টারপ্রাইজেস' এর বোর্ড অব ডিরেক্টরস এর একজন সদস্য এবং এখানে তার শেয়ারও আছে।
https://en.m.wikipedia.org/wiki/Central_European_Media_Enterprises
তার নিয়ন্ত্রণাধীন 'ওয়ান প্লাস ওয়ান মিডিয়া গ্রূপ' ইউক্রেনের আটটি টিভি চ্যানেল পরিচালনা করে।
https://en.m.wikipedia.org/wiki/1%2B1_Media_Group
ইউক্রেনের সবচেয়ে বড়ো প্রাইভেট ব্যাংক 'প্রিভাত' ব্যাংক এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান এই লোক।
https://en.m.wikipedia.org/wiki/PrivatBank
এগুলো ছাড়াও তার লোহা, তেল, এয়ারলাইন্স ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক দেশে ব্যবসা আছে। কলোময়স্কি তার ব্যবসাগুলো সুইজারল্যান্ড থেকে নিয়ন্ত্রণ করে। তার বিরুদ্ধে ইউক্রেনে হুমকির মাধ্যমে ব্যবসা বৃদ্ধির দুর্নাম আছে এবং আলেকজান্ডার ঝুকোভ এর 'জেকেএক্স অয়েল এন্ড গ্যাস' এর ভাগ্যেও এমনটাই হয়েছে বলে প্রমাণ আছে।
https://en.m.wikipedia.org/wiki/JKX_Oil_%26_Gas
সেসময় এই কোম্পানির সাথে যুক্ত ছিলেন দমিত্র ফিরতাশ, যিনি কিনা পশ্চিমাপন্থী ইউক্রেনীয় রাজনীতিবিদদের চক্ষুশূল!
https://en.m.wikipedia.org/wiki/Dmytro_Firtash
রাশিয়া কর্তৃক ক্রিমিয়া দখলের পর কলোময়স্কির ঐ অঞ্চলের সম্পদগুলো জাতীয়করণ করা হয়। পূর্ব ইউক্রেনে হাজার হাজার রুশ হত্যার জন্য যেসব অপারেশন চালায় ইউক্রেন সরকার, সেগুলোর বিশাল অংশ ফান্ডিং করতো এই লোক। কলোময়স্কি পশ্চিমাপন্থী জুলিয়া তিমোশেঙ্কোর পিছনের অন্যতম বড় ফান্ড যোগানদাতা। তাছাড়া ইউডিএআর এর সবচেয়ে বড় ফান্ডদাতা হিসেবে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে।
https://en.m.wikipedia.org/wiki/Ukrainian_Democratic_Alliance_for_Reform
এই লোক পূর্ব ইউক্রেনের প্রত্যেক বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ধরে আনতে দশ হাজার মার্কিন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করে এবং তাদের খুন করার অস্ত্র জোগাড়ে অর্থ সহায়তা করে। সে দশ মিলিয়ন ডলার খরচ করে দনিপ্রো ব্যাটালিয়ন বানানোর পিছে।
https://en.m.wikipedia.org/wiki/Dnipro-1_Regiment
তাছাড়া আইদার, আযভ, দোনবাস ভলান্টিয়ার ব্যাটালিয়ন ইত্যাদি উগ্রপন্থী দলগুলো তৈরির পেছনে সে বিপুল পরিমাণে অর্থ প্রদান করে।
https://en.m.wikipedia.org/wiki/Aidar_Battalion
https://en.m.wikipedia.org/wiki/Azov_Battalion
https://en.m.wikipedia.org/wiki/Territorial_defence_battalions_(Ukraine)
এই ক্রিমিনালের ব্যক্তিগত মিলিশিয়া বাহিনী আছে যারা তার নানা কুকর্ম বাস্তবায়ন করে। বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা ওলেগ সারইয়ভ এর জন্য এই বদমাইশ পাঁচ লক্ষ মার্কিন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করে।
https://en.m.wikipedia.org/wiki/Oleg_Tsaryov
এফসি দনিপ্রো এর মতো ফুটবল ক্লাব এর মালিক এই লোক।
https://en.m.wikipedia.org/wiki/FC_Dnipro
এছাড়া বাস্কেটবল ক্লাব বিসি দনিপ্রো, হকি ক্লাব এইচসি বুদিভেলনুক এর মালিক এই লোক।
https://en.m.wikipedia.org/wiki/BC_Dnipro
https://en.m.wikipedia.org/wiki/HC_Budivelnyk
দনিপ্রোপেত্রোভস্ক ওবলাস্ট এর গভর্নর এর দায়িত্ব শেষে তার মার্কিনি ভিসা জুটে যায় এবং সে তার অনেকটা সময় মার্কিন মুল্লুকে কাটায়। তাছাড়া এই লোক উগ্র ডানপন্থী ইউকেআরওপি পার্টির নেতা।
https://en.m.wikipedia.org/wiki/UKROP
.........................................................................................
নেরুদার স্মৃতিকথা থেকে স্তালিন সম্পর্কে কিছু জানা যাক। তিনি 'স্তালিন পুরস্কার' কমিটির অন্যতম সভ্য হিসেবে দৃঢ়তার সাথে বলেছেন যে, স্তালিন কোনোদিন এই পুরস্কার সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যাপারে প্রভাব বিস্তারের বিন্দু মাত্র চেষ্টা করেননি। স্তালিনের ব্যাপারে বিরুদ্ধ মত নির্মমভাবে দমনের কাল্পনিক মিথ পশ্চিমারা ছড়িয়ে দিলেও (সেগুলোর বঙ্গ ভার্সন এর অন্যতম প্রধান প্রচারক এই অভিজিৎ রায়) কয়েকটা ঘটনা থেকেই মানুষটা কেমন ছিলেন জানা যায়। সোভিয়েত সাহিত্যিক ইলিয়া এরেনবুর্গ স্তালিনের অন্যতম কঠোর সমালোচক ছিলেন। অথচ স্তালিন নিজে এই সাহিত্যিককে ফোন করে জানিয়েছিলেন তিনি লেখকের 'পারির পতন' উপন্যাসটি পড়েছেন এবং এই ধরণের উপন্যাস আরও লিখতে লেখককে অনুরোধ জানান। মায়াকোভস্কিকে গোঁড়া সোভিয়েত সমালোচকেরা পছন্দ করতেন না সোভিয়েত ব্যবস্থার নানা ব্যাপারে তার বিরূপ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। এই সাহিত্যিকের প্রণয়ী লিলি ব্রিক স্তালিনকে লেখা এক চিঠিতে অনুরোধ করেছিলেন মায়াকোভস্কির অমর সৃষ্টিগুলো রক্ষা করতে। চিঠির উত্তরে স্তালিন লিখেছিলেন-
"সোভিয়েত সাহিত্যে মায়াকোভস্কি সর্বোত্তম কবি।"
স্তালিনের নির্দেশে মায়াকোভস্কির বহু স্মৃতিস্তম্ভ তৈরী হয় এবং তার সৃষ্টিগুলোর বহু সংস্করণ প্রকাশ করা হয়। প্রতিবিপ্লবীদের সাথে মাখামাখি এবং সরকারের নীতির প্রকাশ্য বিরোধিতার পরও দিমিত্রি শোস্তাকোভিচ এর মতো সংগীত প্রতিভার বিরুদ্ধে স্তালিন ব্যবস্থা নেননি সোভিয়েত ইউনিয়নের শিল্প-সাহিত্যের স্বার্থে। বিখ্যাত চিত্র পরিচালক সের্গেই আইজেনস্টাইন সমকামী হয়েও স্তালিনের আমলে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পেরেছেন। প্রতিবিপ্লবীদের সমর্থনের পরও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিখ্যাত কবি বরিস পাস্তেরনাক ছাড়া পান স্তালিনের আদেশে।
.............................................................................................
সমাজতান্ত্রিক দেশে বাক স্বাধীনতা ও ব্যক্তি স্বাধীনতা নেই, এই অপপ্রচার দুনিয়াব্যাপী পুঁজিবাদের দালালদের একটা অতিপ্রিয় পেশায় পরিণত হয়েছে। স্বাধীনতা বলতে কি বুঝায় তা সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে না পারলে জোঁকেদের এই সূক্ষ্ম চতুরতা ও হেয়ালিপূর্ণ অপপ্রচারের গােলকধাঁধা হতে বের হয়ে আসা কারও পক্ষে সহজ ব্যাপার নয়। স্বাধীনতার মূল কথা হলো বাঁচার অধিকার এবং বাঁচার জন্যে যা যা দরকার তা পাওয়ার অধিকার। যার বাঁচার অধিকার বা সুযােগ অর্থাৎ অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নেই, তার কোনো স্বাধীনতা নেই। প্রত্যেকটি মানুষের বাঁচার অধিকার বলতে আমরা বুঝি তার খাদ্য, বাসগৃহ, কাজ, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা এবং কিভাবে সবাই সুন্দরভাবে বাঁচতে পারে সে বিষয়ে মতামত প্রকাশের পুরােপুরি অধিকার। যে রাষ্ট্র তার প্রত্যেক নাগরিককে এই সকল অধিকারের গ্যারান্টি দেয় সে রাষ্ট্রে নাগরিকদের স্বাধীনতা আছে। যে রাষ্ট্র নাগরিকের এই অধিকারগুলো স্বীকার করে না সে রাষ্ট্রে নাগরিকদের স্বাধীনতা নেই। মুক্তির অর্থ ক্ষুধা হতে দেহের মুক্তি, অজ্ঞানতার অন্ধকার হতে মনের মুক্তি, বেকারত্বের অভিশাপ হতে মুক্তি, দেশী ও ও বিদেশী শােষণ হতে মুক্তি। শােষণভিত্তিক রাষ্ট্রে জনগণের প্রকৃত স্বাধীনতা নেই। সেখানে জমির মালিক হলো আধুনিক যুগের জমিদাররা। কৃষক হলো ভূমিদাস। জেলে হলো জলদাস। গুটি কয়েক ধনীর মালিকানাধীন কলকারখানার শ্রমিক আর কর্মচারী হলো কলদাস কিংবা বেতন দাস। এই সকল রাষ্ট্রে জমি ও জমার মালিক এই শােষকগােষ্ঠী জনগণকে অমানুষিকভাবে শােষণ করে তাদের পশুর মত খাটিয়ে ও মানুষের মতো বাঁচতে না দিয়ে তাদের বাঁচার দাবি অর্থাৎ স্বাধীনতা অস্বীকার করে। আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের আওতাভুক্ত এই তথাকথিত 'স্বাধীন বিশ্ব' এর দেশসমূহে জনগণের স্বাধীনতা অর্থাৎ বাঁচার অধিকার স্বীকার করা হয় না। এসব দেশের জনগণের শুধু রােগে শােকে অনাদরে অনাহারে মরার স্বাধীনতা আছে। অপর নাগরিকের অধিকারে হস্তক্ষেপ না করে যে পরিমাণ অধিকার বা সুযােগ-সুবিধা একজন নাগরিক ভােগ করতে পারে তার নাম স্বাধীনতা। অপরের অধিকার হরণ করার নাম স্বাধীনতা নয়। সেটা হলো স্বেচ্ছাচারিতা বা অত্যাচার। একজন কৃষক পরিবারের নিজেদের ভরণ পােষণ হয় মতো জমির অধিকার থাকতে হবে। কিন্তু কেউ যদি বলে তার যত খুশি তত পরিমাণ জমির মালিক হওয়ার স্বাধীনতা কেন থাকবে না, তখন বুঝতে হবে সে তথাকথিত স্বাধীনতার নামে অপরের অধিকার অর্থাৎ স্বাধীনতা হরণ করতে চাইছে। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কিভাবে উৎপাদন বাড়ানো যায় এবং কিভাবে সকলের জন্য ন্যায়ভাবে ভাগ করা যায় সে বিষয়ে খসড়া জাতীয় পরিকল্পনা তৈরী করে তার উপর প্রত্যেক নাগরিকের সুচিন্তিত মতামত নেয়া হয়। তাদের মতামত বিবেচনা করে চূড়ান্ত জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।শােষণভিত্তিক রাষ্ট্রে কয়েকজন উচ্চপদস্থ আমলা গুটি কতক শােষকের স্বার্থে পরিকল্পনা তৈরী করে। একেই 'জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা' নাম দেয়া হয় এবং জনগণের উপর তা চাপিয়ে দেয়া হয়। জনসাধারণ তো দূরের কথা, এই পরিকল্পনা সম্পর্কে সাধারণভাবে শিক্ষিত লােকেরও মতামত নেয়া হয় না। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গ্রাম্য কাউন্সিল হতে উচ্চতম পরিষদ পর্যন্ত সার্বজনীন ভােটাধিকারের ভিত্তিতে কৃষক, মজুর মেম্বার নির্বাচিত হয়ে দেশের শাসনকার্য পরিচালনা করে। অবশ্য এটি সত্য যে, স্বাধীন বিশ্বের দেশগুলোর মত সমাজতান্ত্রিক দেশে আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ ও তার পদলেহনকারী জোতদার মহাজন, ধনিক বণিকের শােষণের সপক্ষে প্রচারের স্বাধীনতা নেই। স্বাধীনতার অর্থ কি অন্যকে শােষণ করা, অন্যের স্বাধীনতা হরণ করা?
অভিজিৎ রায় যাকে গুরু মানতেন সেই প্রবীর ঘোষের মুখে শোনা যাক সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা কেমন হয়-
"১৯৬৬ সালের ৮ আগস্ট চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি 'সাংস্কৃতিক বিপ্লব' বিষয়ে ১৬ দফা সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন। তাতে মানুষের চেতনার উত্তরণের জন্য দেশ জুড়ে যুক্তিবাদীদের ব্যাপক প্রসার চাওয়া হয়েছিল, চাওয়া হয়েছিল দেশ জুড়ে যুক্তিবাদী চিন্তার প্রয়োগ। ঘোষণায় দ্বিধাহীন ভাষায় বলা হয়েছিল: সর্বহারাদের মহান সাংস্কৃতিক বিপ্লবের একমাত্র পথ হচ্ছে জনগণ নিজেরাই নিজেদের মুক্ত করবেন। এ মুক্তি চেতনার মুক্তি। এ মুক্তি আসবে যুক্তির পথ ধরে, ব্যাপক বিচার-বিতর্কের পথ ধরে। এই অতি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সিদ্ধান্তগুলোতে অতি মাত্রায় জোর দেওয়া হয়েছিল জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক যুক্তিবাদী মানসিকতা প্রচারের উপরে। বলা হয়েছিল দেশ জুড়ে যুক্তিবাদী মানুষ গড়তে বিচার-বিতর্ক চালাও। মনে রেখো, এই বিচার-বিতর্ক কখনোই কলহ নয়। স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছিল, জনগণের মধ্যে বিভিন্ন মত থাকাই স্বাভাবিক এবং বিভিন্ন মতামতের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রয়োজনীয়, উপকারী ও অনিবার্য। পরিপূর্ণ বিতর্কের অবকাশ সৃষ্টিতে জনগণের মধ্যে যুক্তিবাদের প্রতি আকর্ষণ বাড়বে। ফলে যুক্তির নিরিখে জনগণই যেটা সঠিক তাকে প্রতিষ্ঠা করবে, যেটা বেঠিক তাকে শোধরাবে এবং এভাবেই ক্রমে তারা একমতে পৌঁছবে। আর সেই মতটা অবশ্যই হয়ে দাঁড়াবে যুক্তিনিষ্ঠ। যুক্তিবাদীর পথ ধরে যখন জনচেতনা এগুবে তখন সেই জনচেতনা অবশ্যই সঠিক পথ দেখাবে। যুক্তিবাদী মানসিকতাই জনগণকে পরিচালিত করবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে, আমলাতন্ত্র ঘোচানোর সংগ্রামে, বঞ্চনা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সংগ্রামে, নীতিবোধ ও ন্যায়বোধ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে। এগুলো কোনওটাই পৃথক পৃথক ব্যাপার নয়, পরস্পর সম্পর্কিত। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর ধনতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তনের সম্ভাবনা কিন্তু নিঃশেষ হয়ে যায় না। এই সম্ভাবনা দেখা দেয় মানুষের ব্যক্তিগত লোভের পথ ধরে। কিছু মানুষ জনসাধারণকে বঞ্চিত করার কুমতলবে নানাভাবে মগজ ধোলাই করতে শুরু করে। এই লোভী মানুষগুলোকে বিশেষ সুবিধাভোগী মানুষে, শোষকে রূপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়াকে ব্যর্থ করে দিতে পারে যুক্তিবাদী চিন্তাধারা, সাংস্কৃতিক বিপ্লব। যুক্তিবাদ প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি কী হবে? সে বিষয়ে বলা হয়েছে - জনগণের কাছে তথ্য হাজির করো, যুক্তি হাজির করো। মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি যেহেতু যুক্তির দিকে আকর্ষিত হওয়া, তাই সঠিক যুক্তি, সুযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হতে থাকলে জনগণ সেই সুযুক্তিকে গ্রহণ করবেই। এতদিনকার যুক্তিহীনতার কারণ অবশ্যই এই - সুযুক্তির সঙ্গে তার পরিচয় ঘটেনি। সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যে পদ্ধতি নিষিদ্ধ ছিল তা হলো - বল প্রয়োগ করে কাউকে নতিস্বীকারে বাধ্য করো না। বলপ্রয়োগে চেতনার মুক্তি ঘটে না। বলপ্রয়োগ যুক্তিবাদের বিকল্প নয়, ভুল যুক্তির মানুষদেরও তাদের মতামতের সপক্ষে যুক্তি হাজির করার অধিকার দেওয়া উচিত। চিন্তা করার সাহস, প্রশ্ন করার সাহস এবং কাজ করার সাহস নিয়ে যে তেজ, সেই তেজের বিকাশ ঘটানোই বিপ্লবীর কর্তব্য, যুক্তিবাদভিত্তিক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কর্তব্য। কোনও কিছুকে মেনে নেওয়ার আগে প্রয়োজনে প্রশ্ন করে নিজের কাছে বিষয়টা পরিষ্কার করে নাও। অন্ধ আনুগত্যের মধ্য দিয়ে প্রশ্নহীন আনুগত্যের মধ্য দিয়ে নেতাদের বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণিতে পরিণত হওয়ার সুযোগ দিও না। প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করো, প্রতিটি বঞ্চনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করো, প্রতিটি দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করো, ধনতান্ত্রিক চিন্তার অনুসরণকারীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করো। এগিয়ে যাবে, সুস্থ সংস্কৃতির দিকে এগিয়ে যাবে। এই যে আন্দোলন, সমাজ ও সংস্কৃতির আন্দোলন, জনগণ কর্তৃক জনগণকে মুক্ত করার আন্দোলন, এরই নাম 'সাংস্কৃতিক বিপ্লব'। সাংস্কৃতিক আন্দোলন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে বলা হয়েছিল বিতর্কের ঝড় তুলতে প্রচারকে তুঙ্গে তোলো, বড় হরফের প্রচারপত্রে হাজির করতে থাকো বিতর্ক, যুক্তিবাদের পক্ষে প্রচার, বঞ্চনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আহ্বান। এইসব প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই মানুষের মধ্যে যুক্তির প্রতি আগ্রহের সঞ্চার হবে; ফলে বহু কুসংস্কার, ভূতপ্রেত ইত্যাদি চিন্তার আবরণ খুলে পড়বে, খসে পড়বে কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসকে জিইয়ে রেখে বঞ্চনা চালিয়ে যাওয়ার প্রয়াসগুলো। অতি স্পষ্টতই চিনা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল প্রাচীন কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, অলৌকিকত্বে বিশ্বাস এবং অবতার পূজার মতো বঞ্চনার হাতিয়ার, প্রগতির পরিপন্থী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে জনগণের চেতনার উন্মেষ ঘটানো।"
- 'সংস্কৃতি: সংঘর্ষ ও নির্মাণ', প্রবীর ঘোষ
...........................................................................................
মাওবাদী দমনে নিযুক্ত আট মাসের অন্তঃসত্ত্বাকে খোলা চিঠি
"বোন
সুনয়না প্যাটেল,
এই বছর আন্তর্জাতিক নারী দিবসে এএনআই, হিন্দুস্তান টাইমস সহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে তোমার কথা পড়লাম। সংবাদ সংস্থাগুলো লিখেছে আট মাসের সন্তান পেটে ধরে তুমি মাওবাদী দমনের ডিউটি করে যাচ্ছ। সংবাদ সংস্থাগুলো কাজের প্রতি তোমার এই নিষ্ঠাকে নারী দিবসে উদযাপন করেছে। কর্তৃপক্ষের চাপ ছাড়াই এই ঝুঁকি তুমি যদি স্বেচ্ছায় নিয়ে থাকো তবে আমি তোমার নিষ্ঠাকে সম্মান না জানিয়ে পারিনা। কিন্তু এর সাথে কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করতে চাই, যে প্রশ্ন কোনো নারী দিবস উদযাপনকারী সংবাদসংস্থা গুলো করেনি। কেন তুমি মাতৃত্বকালীন ছুটি পাওনি? তুমি যাদের বিরুদ্ধে বন্দুক ধরেছো সেই কমিউনিস্টরা দীর্ঘ দিন ধরে নারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটির দাবি জানিয়ে এসেছে। মাতৃত্বকালীন ছুটি এখন আমাদের সমাজে যে কোনো ব্যবসায়িক সংস্থাতেও স্বাভাবিক ব্যাপার। যদিও এরকম অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায় যে ছুটির শেষে আর সে চাকরি ফেরৎ পায়নি। কিন্তু তুমি তো সরকারি চাকরি করো। ভারত সরকার কি এখন যে কোনো মুনাফাখোর বেসরকারি সংস্থার থেকেও বেশি অমানবিক হয়ে পড়েছে নিজের কর্মচারীদের প্রতি, বিশেষত যারা নাকি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ডিউটি করে যাচ্ছে? সংবাদ সংস্থাগুলো থেকেই জানলাম তোমাকে একে ফরটি সেভেনের ভার ছাড়াও আরো ৮-১০ কিলো সামরিক সরঞ্জামের ওজন বহন করতে হচ্ছে। পরিচিত হোক বা অপরিচিত, আমাদের দেশের যে কোনো সাধারণ মানুষের এই সংবেদনশীলতা আছে যে সন্তানসম্ভবা মহিলার হাত থেকে ভারি ব্যাগ নিয়ে তারা নিজেরা বয়ে দেন। ভারতের নিরাপত্তাবাহিনীর কর্তারা কি ন্যূনতম সংবেদনশীলতাটাও হারিয়েছে? যখন রাষ্ট্রের তোমার প্রতি যত্ন নেওয়া এবং সুরক্ষা দেওয়ার পালা তখন তোমাকেই এই রাষ্ট্রকে সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। কেমন রাষ্ট্রকে সুরক্ষা দিচ্ছো তুমি? ভারত সরকার কি এমনই সুপার পাওয়ার? ক্ষমতাশালীদের বিরুদ্ধে শ্রমজীবী নারীদের লড়াই ইতিহাসে নারী দিবসের জন্ম দিয়েছে। তুমি যাদের বিরুদ্ধে বন্দুক ধরেছো তাদের নেত্রী ক্লারা জেটকিন ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারীদিবস পালনের সূচনা করেন। ৮ মাস গর্ভবতী অবস্থায় ভারি বোঝা নিয়ে কমিউনিস্ট দমনে তোমার ডিউটি পালন করাকে কর্পোরেট মিডিয়া উদযাপন করছে। অথচ এই খবরটা আসলে কর্মস্থলে অমানবিকতার নিদর্শন হতে পারতো। কিন্তু ভারতের মিডিয়ার বড়ো অংশ আজ নির্লজ্জতার চরম সীমায় পৌঁছেছে বা হয়তো নির্বোধ আধা সেনা কর্তৃপক্ষ বা সরকার মিডিয়া ডেকে এনে এই খবর করিয়েছে। তোমাকে দেখিয়ে নারী দিবস উদযাপন দেখে, সতী তকমা দিয়ে জ্যান্ত বিধবাকে পুড়িয়ে মারার সময় ঢাক ঢোল পিটিয়ে সতীর নামে জয়ধ্বনি দেওয়ার রেওয়াজের কথা মনে পড়লো। আমাদের দেশে সেনা আধিকারিকরা প্রকাশ্যে ঘোষণা করে মেয়েরা যুদ্ধ করতে পারেনা, তাই সেনাবাহিনীতে নারীদের সেবা মূলক কাজ করতে হবে। এমনকি কোর্টে তারা জানিয়েও দিয়েছে যে কোনো মহিলার কমান্ডে চলা পুরুষ সেনাদের পক্ষে সম্ভব নয়। ছত্তীসগঢ়ে আছো যখন তখন নিশ্চয়ই অভিজ্ঞতা থেকে জানো যে মেয়েরা কেমন যুদ্ধ করতে পারে! বিভিন্ন সংবাদ সংস্থায় বেড়িয়েছে যে তুমি যে কমিউনিস্ট গেরিলাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছো তাদের মধ্যে ৪০-৬০% হলেন নারী। এই নারী কমিউনিস্টরা লড়াই করে ঘটুল প্রথা বন্ধ করেছে, বুকে কাপড় রাখার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে, জমিতে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। সরকারি হিসেব অনুযায়ী তুমি যে মাওবাদী অধ্যুষিত অঞ্চলে ডিউটি করছো সেখানে কিন্তু তোমার প্রতিপক্ষ কমিউনিস্ট বোনেরা বাল্য বিবাহের হার দেশের মধ্যে সবচেয়ে নীচে নামিয়ে আনতে পেরেছে। তারা সমান্তরাল জনতানা সরকারে নারীদের ৫০% আসনের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছে। অন্য দিকে তুমি যেই সরকারকে রক্ষা করতে পেটে সন্তান নিয়ে ডিউটি করছো তারা ১৯৯২ সালে আঞ্চলিক প্রশাসনে ৩৩% আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত করতে পারলেও, সংসদে নারীদের জন্য ৩৩% আসন সংরক্ষনের বিলটি আজ পর্যন্ত পাস করাতে পারেনি। কমিউনিস্টরা দাবি করে তারা বর্তমান ভারত সরকারকে উচ্ছেদ করে এমন সমাজ প্রতিষ্ঠা করবে যেখানে তোমার সন্তানের দ্বায়িত্ব নেবে সরকার, তোমার আর্থিক সংগতির উপর তোমার সন্তানের শিক্ষার অধিকার নির্ভর করবে না। যেখানে তোমার পেনশন প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা শেয়ার মার্কেটে জুয়া খেলার উপর ছেড়ে দেওয়া হবে না। অবসরের পরে সরকারি দেখভালের সুবিধা পাওয়া তোমার অধিকার হবে। কমিউনিস্টরা বলে তুমি মুনাফাখোর পুঁজিপতিদের হয়ে লড়ছো আর তারা দেশের জন্য লড়ছে। যদি এটা ধরে নেওয়া হয় দু' তরফই একটাই দেশের জন্য লড়ছে তাহলে এটা স্পষ্ট যে একই দেশের দুটি ধারণা পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়ছে। এবার বলো তুমি তোমার সন্তানকে কী রকম দেশ উপহার দিতে চাও? ভারতে বর্তমান আধা-সামন্ততান্ত্রিক আধা-ঔপনিবেশিক কাঠামো টিকে থাকুক বা ভারত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হোক, যাই হোক না কেন তোমার সন্তানই আগামী ভারতের নাগরিক। তার সুস্বাস্থ্যের উপর দেশের সুস্বাস্থ্য নির্ভর করছে। নিজের ও সন্তানের যত্ন নিও।
- ভাই, সৌম্য মন্ডল"



Comments