ভারতবর্ষে সাংস্কৃতিক আন্দোলন : কেউ কথা রাখেনি

 

'ইয়ং-বেঙ্গল' বা বাংলার 'রেনেসাঁস'

উনিশ শতকের গোড়ায় শহর কলকাতায় কিছু নতুন চিন্তা-ভাবনা নিয়ে হাজির হয়েছিলেন কিছু উদ্দীপ্ত মানুষ। সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন সংস্কৃতি গবেষক ও ঐতিহাসিক উনিশ শতকের এইসব সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নায়কদের চিহ্নিত করেছেন 'ইয়ং-বেঙ্গল', 'ডিরোজিয়ান', 'রেনেসাঁস যুগের পুরোধা' ইত্যাদি বিশেষণে। এঁরা ইউরোপের সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান, শিল্পকলা, বেশভূষা, খাদ্যাভ্যাস, পানাভ্যাস ইত্যাদির দ্বারা অতিমাত্রায় প্রভাবিত হয়েছিলেন। বঙ্গীয় রেনেসাঁস প্রবক্তা হিসেবে পরিচিতদের যেটি প্রধান ও স্থায়ী কৃতি তা হলো ত্রুটি এবং অসম্পূর্ণতা সত্ত্বেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিকাশের ক্ষেত্রে এক বিশাল উল্লম্ফন। যদিও এইসব সাহিত্যের ক্ষেত্রে বৌদ্ধিক দুর্বলতা ছিল। প্রবন্ধ সাহিত্য ছিল বেশিটাই রম্যরচনা অথবা জিজ্ঞাসাবিহীন ভাষা। উপন্যাসে ও প্রবন্ধে তৎকালীন রাজনৈতিক পরিবেশের যুক্তিযুক্ত, বাস্তববোধ সম্পন্ন কোনও প্রতিফলন ছিল ভীষণ রকম অনুপস্থিত। এই বঙ্গীয় রেনেসাঁসের যুগের মহানায়কদের প্রভাবে উনিশ শতকে বাঙালি শিক্ষির সমাজের কিছু মানুষ অতি স্পর্শকাতর বিভিন্ন অন্ধ সংস্কারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে সক্রিয় হয়েছিলেন। সতীদাহ, বাল্য বিবাহ, কুলীনপ্রথা, জাতিভেদ ইত্যাদির বিপক্ষে এবং বিধবা বিবাহের পক্ষে এই সময়ই আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, যা ছিল অবশ্যই এক সাংস্কৃতিক আন্দোলন। এরই পাশাপাশি এঁরা অনেকে গোমাংস ভক্ষণ, মদ্যপান, স্নানাহ্নিক না সোরে খাদ্যগ্রহণ, ইউরোপীয় বেশভূষা ধারণ ইত্যাদির মধ্য দিয়েও সমাজের অভ্যস্ত জড়তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। তাঁদের এই প্রতিবাদের, এই আন্দোলনের ফলে আমাদের সমাজ জীবনে কিছুটা গতিশীলতা নিশ্চয়ই এসেছিল, দেখা দিয়েছিল সাংস্কৃতিক জগতে কিছুটা প্রগতির হাওয়া। এই সময় বঙ্গীয় রেনেসাঁস আন্দোলনের পুরোধা রামমোহন খ্রিস্ট ধর্মের সঙ্গে হিন্দু ধর্মের মেলবন্ধন ঘটিয়ে গড়ে তুলেছিলেন একেশ্বরবাদী নিরাকার প্রভুর তত্ত্ব, ঈশ্বর তত্ত্ব। ইউরোপের রেনেসাঁস নিয়ে ছোট্ট একটু আলোচনা সেরে না নিলে বঙ্গীয় রেনেসাঁস নিয়ে একটা ভোঁতা চিন্তা, অস্বচ্ছ ধারণা থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা অতি প্রবল। যে ঘটনার নির্দেশক হিসেবে 'রেনেসাঁস' শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয়েছিল, তার স্থান ও উৎস ছিল ইউরোপে। কনস্টান্টিনোপাল-এর পতনের (১৪৫৩ সাল) পর গ্রিক উদ্বাস্তুদের ইতালিতে আগমন এবং তৎপরবর্তীকালে একই সময়ে ইতালিতে বহু জিজ্ঞাসু, যুক্তিনিষ্ঠ, মৌলিক প্রতিভাবান ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটে। সমাজের প্রগতি নির্ভর করে জ্ঞানের প্রগতির উপর, অর্থাৎ সংস্কৃতির প্রগতির উপর। মধ্যযুগে চার্চ ও রাষ্ট্রশক্তির অত্যাচারে ইউরোপীয় সমাজ ছিল অজ্ঞানতার তমসায় আচ্ছন্ন। প্রতিভাবানদের জ্ঞান চর্চা, তাদের চিন্তা-চেতনার প্রতিফলন ঘটে সমাজ ও সাংস্কৃতিক জীবনে; অর্থাৎ বিজ্ঞান, কলা, বাণিজ্য ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে। সমাজ ও সংস্কৃতির এই বিরাট উত্তরণ বা উল্লম্ফনকেই অভিহিত করা হয় 'রেনেসাঁস' নামে। তারপর ইতালির রেনেসাঁসের হাওয়া ছড়িয়ে পড়ে ইতালি থেকে ফ্রান্সে এবং পরবর্তীকালে ইউরোপের আরও বহু দেশে। ইউরোপের এই 'রেনেসাঁস' ছিল সামন্তপ্রথার বিরুদ্ধে শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও বণিকশ্রেণির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আর্থ-সামাজিক ও সমাজ-সাংস্কৃতিক পরিবেশ পাল্টাবার আন্দোলন। এই আন্দোলন শুধু শহরে সীমাবদ্ধ থাকেনি, ছড়িয়ে পড়েছে গ্রাম থেকে গ্রামে। এখন আর রেনেসাঁস শব্দটির প্রয়োগ শুধুমাত্র ইউরোপের ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ নেই। আমেরিকা, জাপান, চীন, আফ্রিকা, ভারত ইত্যাদি দেশের ক্ষেত্রে নতুন যুগকে, বিশাল প্রগতিকে চিহ্নিত করতে এই 'রেনেসাঁস' শব্দটিকেই ব্যবহার করছেন বুদ্ধিজীবীরা, ঐতিহাসিকরা।

এবার আমরা বিশ্লেষণ করে দেখবো ইউরোপের তুলনীয় কোনও রেনেসাঁস আমাদের দেশে হয়েছিল কি না; অথবা যা হয়েছিল তা নিছকই সমাজের উপর তলার কিছু ইংরেজি শিক্ষিত মানুষের সীমাবদ্ধ প্রয়াস কি না। উনিশ শতকের বঙ্গীয় রেনেসাঁসের সঠিক মূল্যায়ন করতে চাইলে এই সময়কার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থাকে জানতেই হবে। নতুবা পরবর্তী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থার প্রগতি সত্যিই কতটা হয়েছিল, তার হদিশ পাবো কী করে? ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসকদের সহযোগী ছিল ভারতীয় বণিক সম্প্রদায় এবং জমিদার শ্রেণি। একসময় কলকাতা ছিল ইংরেজ শাসকদের রাজধানী। এই সময়কার বাঙালি ব্যবসায়ী ও বণিক সম্প্রদায় মোটেই স্বাধীন বা স্বনির্ভর ছিল না। তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল ব্রিটিশ শাসনের উপরই নির্ভরশীল। তার উপর জমিদার শ্রেণিও ছিল নিজ স্বার্থেই একান্তভাবে ব্রিটিশ শাসনের সমর্থক। ব্রিটিশ সরকার যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রবর্তন করে, তার ফলে এই বন্দোবস্ত মতো সরকারকে নির্দিষ্ট রাজস্ব দেওয়ার বিনিময়ে জমিদাররা পেলো জমির উপর নিঃশর্ত মালিকানাস্বত্ব। জমিদার হলো কৃষকদের জমির মালিক। কৃষকরা এর ফলে পুরোপুরিভাবে জমিদারের ইচ্ছের উপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হলো। জমিদারের ইচ্ছের উপর রইলো কৃষককে চাষ করতে দেওয়ার বা উচ্ছেদ করার অধিকার। জমিদার ঠিক করে দিতো কৃষক কতটা খাজনা দিতে বাধ্য থাকবে। খাজনা দিতে না পারলে কৃষককে আটকে রাখবার, তার অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার এবং তাকে জমি থেকে উৎখাত করার অধিকার জমিদারদের দিলো ব্রিটিশ সরকার। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ভারত ছিল একটি বিশাল উৎপাদনকারী দেশ এবং একই সঙ্গে কৃষি ভিত্তিক দেশ। ভারতের তাঁত বস্ত্র এই সময় এশিয়া ও ইউরোপের বাজারে রপ্তানি করা হতো। এছাড়াও যেতো সিল্ক, লবণ, সোরা ও মশলা। এই সময় দেশে বেকার যেমন কেউ ছিল না, তেমনই ছিল না কোনও ভূমিহীন কৃষক। এই কথাগুলো কোনও অতীত সুখ কল্পনার আবেগে লেখা নয়। এসবই ঐতিহাসিক সত্য। অতুলচন্দ্র গুপ্ত সম্পাদিত 'Studies in Bengali Renaissance' গ্রন্থে প্রকাশিত এন. কে. সিন্‌হা লিখিত 'Economic Background of the country'-তেও আমার এই কথাগুলোরই সমর্থন মিলবে। কিন্তু চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত শুরু হতেই শুরু হয়ে গেলো দেশীয় শিল্প-বাণিজ্যের দ্রুত অধঃপতন। এবং মাত্র বছর পঁচিশের মধ্যেই বাঙালির শিল্প-বাণিজ্য ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়ালো। দেশীয় শিল্প ধ্বংস করে দেশীয় বাজারকে প্রায় পুরোপুরি গ্রাস করলো ব্রিটিশ শিল্প দ্রব্য। ব্রিটিশ সরকার এমনভাবে বাণিজ্যিক নীতি ও আইন তৈরি করতে লাগলো, যার ফলে ভারতে তৈরি হতে লাগলো ব্রিটিশ শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল। ব্রিটিশ সরকার সচেষ্ট হলো তাদের দেশে উৎপন্ন দ্রব্যের বাজার হিসেবে ভারতবর্ষকে দখল করতে। এই সময়কার বাঙালি অগ্রণী শিল্পোদ্যোগী এবং রেনেসাঁস-এর অন্যতম পুরোধা দ্বারকানাথ ঠাকুর গভীর হতাশা থেকে বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, ব্রিটিশরা এদেশীয়দের যা কিছু ছিল সবই কেড়ে নিয়েছে। এখন এদেশীয়দের জীবন, স্বাধীনতা, সম্পত্তি এবং সবকিছুই নির্ভর করছে ব্রিটিশ সরকারের করুণার উপর। এরপর তিনিও ব্যবসা গুটিয়ে তাঁর প্রায় সমস্ত অর্থই নিয়োজিত করেন জমিদারি কিনতে। এভাবে বহু ধনীরাই তাদের অর্থ নিয়োজিত করেছিল জমিদারি কিনতে। ফলে ব্রিটিশদের শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল উৎপাদনকারী ও বিক্রেতা দেশীয় ব্যবসায়ী ও বণিক সম্প্রদায়, ব্রিটিশদের সঙ্গে বাবসা করতে আগ্রহী ব্যবসায়ী ও বণিক সম্প্রদায় এবং বাঙালি জমিদারদের স্বার্থে তাদের পালক ও পোষক ব্রিটিশ রাজ্যের স্বার্থের সঙ্গে জড়িয়ে গেলো। ফলে দেশীয় বণিক শ্রেণি ও জমিদার শ্রেণি ব্রিটিশ সরকারের অস্তিত্ব ও শ্রীবৃদ্ধির মধ্যেই নিজেদের স্বার্থ রক্ষার রক্ষাকবচকে আবিস্কার করলো। বঙ্গীয় জমিদার সম্প্রদায়, জমিদারি রক্ষণাবেক্ষণের কাজে নিয়োজিত কর্মচারী, শহরের বণিক সম্প্রদায় এবং শিক্ষিত উচ্চবিত্ত ও শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় সকলের স্বার্থ সেই সময়কার আর্থ-সামাজিক পরিবেশের প্রভাবে ব্রিটিশ সরকারের স্বার্থের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছিল। ফলে এই সব দেশীয় সাম্প্রদায় এদেশে ব্রিটিশ শাসনের সমর্থক ও সহযোগী হয়ে পড়েছিল। একইভাবে ব্রিটিশ সরকারও ভারতে তাদের উপনিবেশিক শোষণকে কায়েম রাখতে এবং আরও তীব্রতর করতে তাদের সমর্থক ও সহযোগী সম্প্রদায়কে পালন ও পুষ্ট করতে অতি মাত্রায় সচেষ্ট ছিল। ফলে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে বাস্তবিক পক্ষেই অসম্ভব ছিল জমিদারতন্ত্র, স্যমন্ততন্ত্রের ভিত্তিকে ধ্বংস করে এদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য-শিল্পের উন্নতির জন্য তাদের পুঁজি বিনিয়োগে চাপ সৃষ্টি করা। বাংলার রেনেসাঁস আন্দোলনের প্রাণপুরুষদের অধিকাংশই ছিলেন ইংরেজদের সহযোগী অথবা ইংরেজ সহযোগীদের সন্তান। অর্থাৎ সেসময়কার ইয়ং-বেঙ্গলদের অধিকাংশই ছিলেন ইংরেজদের অনুগ্রহধন্য। এইসব বুদ্ধিজীবীদের একটা বিশাল সীমাবদ্ধতা ছিল এই যে, তাঁরা প্রগতিকে ব্রিটিশ প্রগতির সমর্থক হিসেবে গণ্য করেছেন এবং ব্রিটিশরা যে আমাদের দেশে আধা-ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী শোষণ চালিয়ে গেছে, সে কথা বারবারই সজ্ঞানে এড়িয়ে গেছেন। একটি ঔপনিবেশিক দেশে ঔপনিবেশিক প্রভুর বিরোধিতা করাটাই কোনও আন্দোলনের পক্ষে বা ব্যক্তির পক্ষে প্রগতিশীল হিসাবে চিহ্নিত করার মাপকাঠি হওয়া উচিত। ঔপনিবেশিক প্রভুর দালালি করাটা, সহযোগিতা করাটা কোনওভাবেই প্রগতিশীল বলে বিবেচিত হতেই পারে না; বরং তাদের দেশদ্রোহী, ঔপনিবেশিক শক্তির দালাল বলেই চিহ্নিত করা উচিত। শহরবাসী, বণিকশ্রেণি, শিক্ষিত উচ্চ মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, ভূস্বামী শ্রেণির একটি অংশ যাঁরা নিজেদের সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে তথাকথিত 'রেনেসাঁস' আন্দোলনকে 'রেনেসাঁস' ছাপ মেরে দিয়েছিল; 'প্রগতিবাদী', 'নবজাগরণের প্রতিভূ' ইত্যাদি বলে প্রচার চালিয়েছিল সাধারণ মানুষের মগজ ধোলাই করে তদের প্রভাবিত করতে, 'প্রগতি' ও 'ব্রিটিশ সমর্থন'কে সমার্থক হিসেবে মাথায় ঢোকাতে। ইয়ং-বেঙ্গলদের দ্বিতীয় সীমাবদ্ধতা হলো এই তথাকথিত রেনেসাঁসের প্রধান চরিত্রগুলোর অধিকাংশই জনগণের ব্যাপক অংশের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিলেন।

তৃতীয় সীমাবদ্ধতা হলো ওঁদের আন্দোলন ছিল শহরকেন্দ্রিক। গ্রামে এর কোনও প্রভাব দেখা যায়নি। চতুর্থ সীমাবদ্ধতা হলো রেনেসাঁসের সঙ্গে সম্পর্কিত বেশিরভাগ সমাজ সংস্কারই তৎকালীন বাঙালি মুসলমান ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষদের কাছে ছিল অর্থহীন। ইসলাম ধর্মে সতীদাহ নেই, বিধবা বিবাহ আছে, মুসলমানরা গোমাংস খান। অবিভক্ত বাংলার অর্ধেকের বেশি মানুষ যেহেতু মুসলমান, তাই এ কথা তো অবশ্যই সত্য যে বেশিরভাগ বাঙালিদের (মুসলমানদের) কাছে এসবের কোনও প্রাসঙ্গিকতা ছিল না। এ কথাও নির্মম সত্য যে, এইসব সংস্কারের দ্বারা আবদ্ধ না থাকাটাই সমাজ অগ্রগতির সূচক নয়। তারই জ্বলন্ত উদাহরণ ভারতের মুসলিম সমাজ। মুসলিম সমাজে সতীদাহ প্রথা চিরকালই অনুপস্থিত, বিধবা বিবাহ প্রচলিত, কনের পূর্ণ সম্মতিতে বিয়ে দিতে হয় বলে একটা চুক্তি সম্পাদনের ব্যাপারে রয়েছে, অপ্রাপ্তবয়স্কার বিয়ে ইসলামি মতে হতে পারে না। কিন্তু ভারতের মুসলিম সমাজে অপ্রাপ্তবয়স্কার বিয়ে হয় এবং এটা সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র হিন্দু প্রতিবেশীদের প্রভাবে। গোমাংস মুসলমানেরা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করেন। অর্থাৎ যে কয়টি বিষয় ঘিরে বাংলার রেনেসাঁস যুগের সমাজ সংস্কারের ঝোঁক দেখা গেছে, তার প্রায় সবকটি সংস্কারেরই ঊর্ধ্বে ছিল বাংলার মুসলমান সমাজ। কিন্তু তাতে বাংলার মুসলমান সমাজের অগ্রগতি লক্ষিত হয়েছে কি? শোষণ মুক্তি ঘটেছে কি? না, ঘটেনি। বাংলার মুসলমানদের সংখ্যাগুরু অংশই ছিল হিন্দু সংখ্যাগুরু অংশের চেয়ে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়া, বেশি শোষিত। আধুনিক ভারতে নিরাকার ঈশ্বর তত্ত্ব বা একেশ্বরবাদী ঈশ্বর তত্ত্ব পুনঃপ্রবর্তন করেন রামমোহন নন, মুসলমানগণ। পঞ্চমত, রেনেসাঁস আন্দোলনের বিরাজমান হিন্দু ধর্মীয় পক্ষপাতিত্ব মুসলমান চেতনাকে বিচ্ছিন্ন করেছিল। এর ফলে ভারতে যে হিন্দু-মুসলিম ধর্মকে ভিত্তি করে দ্বিজাতিতত্ত্ব মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল, তাতে শোষিত মানুষদের একত্রিত সংগ্রাম চেতনা যেমন বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিল, তেমন এই বিভেদ ব্রিটিশ শাসকদের পক্ষে অতি সহায়ক হয়ে উঠেছিল। মুসলমানদের কাছে অগ্রহণযোগ্য রূপে হিন্দু দেবীর আদলে ভারতমাতার রূপ কল্পনা করে বঙ্কিমচন্দ্র দ্বিজাতিতত্ত্বের বিষবৃক্ষকে পুষ্ট করতে সাহায্যই করেছিলেন। রামমোহনের চিন্তায়-চেতনায় যে মুসলিম বিরোধী মানসিকতা স্থান পেয়েছিল তারই স্ফুরণ দেখতে পাই ১৮০৪ সালে প্রকাশিত তাঁর লিখিত এক প্রবন্ধে, যেখানে তিনি বলছেন, "ইসলামধর্মীরা ব্রাহ্মণ জাতির অনেক ক্ষতি করেছে ও তাদের ওপর অনেক নির্যাতন করেছে।" (রামমোহন রচনাবলী, হরফ প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ১২৭)

বাংলার রেনেসাঁস আন্দোলনের নায়করা প্রত্যেকেই মনে করতেন, 'জাতি ও ধর্ম সমার্থক'। কাজেই জাতির উন্নতি ও মুক্তি বলতে তাঁরা বুঝতেন নিজেদের ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উন্নতি ও মুক্তি। ষষ্ঠত, একগাদা তথাকথিত বুদ্ধিজীবী যতই প্রচারে রামমোহনকে 'ভারতীয় জাতীয়তাবাদের জনক' বলে সোচ্চার হোন না কেন এবং রেনেসাঁস 'ভারতীয় জাতীয়তাবাদ সৃষ্টি করেছিল' বলে স্বীকৃতি দিন না কেন -  এসবই যে বুদ্ধিজীবীদের ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি অথবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দৃষ্টিভঙ্গির ফল, যুক্তির নিরিখে মূল্যায়নে বসলে এই সত্য বারবারই বেরিয়ে আসবে। রামমোহন যে একনিষ্ঠ ব্রিটিশ শাসনের সমর্থক ছিলেন, এই সত্যকে রেনেসাঁসের সমর্থক প্রতিটি বুদ্ধিজীবীই স্বীকার করেন বা বলতে পারা যায়, রামমোহনের জীবনচর্যার বিভিন্ন পর্যায়ে, লেখায়, বক্তব্যে এত বেশি বেশি করে তাঁর ব্রিটিশ শাসন অনুরাগের প্রমাণ ছড়িয়ে রয়েছে যে, রামমোহনের সবচেয়ে বড় সমর্থককেও তা স্বীকার করতেই হয়। বাস্তবিক পক্ষে বিদেশি শাসনের অধীনে রামমোহনের এই জাতীয়তাবাদের মূল কথা ছিল - ব্রিটিশ শাসনের উপর জাতির একান্ত নির্ভরতা, ব্রিটিশ স্বার্থকে জাতীয় স্বার্থ হিসেবে গ্রহণ করা। পরাধীন ভারতে রামমোহনীয় এই জাতীয়তাবোধে ছিল না কোনও রকম বিপ্লবী সত্তা। এমন মেকি জাতীয়তাবোধ থেকে জন্ম নেওয়া পরবর্তী জাতীয়তাবাদী নেতারা তাই ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের পথে না গিয়ে গিয়েছিলেন দর কষাকষির মধ্য দিয়ে আপসে স্বাধীনতা পাওয়ার পথে। এ কোনও বিদ্বেষপ্রসূত বক্তব্য নয়, নয় অজ্ঞতাজনিত বাচাল কথা; এই কথাগুলো ঐতিহাসিক সত্য। রেনেসাঁস উদ্ধৃত এই বিকৃত জাতীয়তাবাদ ছিল বিত্তবান বণিক, জমিদার ও শিক্ষিত সম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষাকারী। এমন জাতীয়তাবোধের ফসল হিসেবেই ১৮৪৩ সালে ধনী ব্যবসায়ী, জমিদার ও শিক্ষিত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে গড়ে উঠেছিল 'ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান সোসাইটি'। ১৮৫১ সালে এই সোসাইটি মিশে গেলো 'ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন'-এর সঙ্গে। ১৮৭৫ সালে সুরেন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠা করলেন 'ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন'। ১৮৮৩ সালে ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের সর্বভারতীয় সম্মেলন হলো কলকাতায়। সম্মেলন সভাপতি আনন্দমোহন বসু একে আখ্যা দিলেন 'ভারতের জাতীয় পার্লামেন্ট' বলে। এই তথাকথিত জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পরিণতিতেই ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হলো 'ভারতের জাতীয় কংগ্রেস'। এইসময় অর্থনৈতিক সংকট যেভাবে দ্রুত বেড়ে চলেছিল এবং সেই সংকটের পরিণতিতে যেভাবে দ্রুত জনক্ষোভ বৃদ্ধি পাচ্ছিল তাতে ব্রিটিশ সরকার যথেষ্টই চিন্তিত হয়ে পড়েছিল। সেই সময়কার ব্রিটিশ ভাইসরয় ডাফরিন গণবিক্ষোভকে প্রশমিত করতে ব্রিটিশ সরকারের সাংবিধানিক গণ্ডিতে আবদ্ধ এক আন্দোলনে আটকে রাখতে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস সৃষ্টিতে মদত দিলেন। ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম সভাপতি ডবলিউ. সি. ব্যানার্জি তাঁর লেখা 'Introduction to Indian Politics' গ্রন্থে দ্বিধাহীন ভাষায় স্বীকার করেছেন কংগ্রেস 'ডাফরিনেরই অবদান'। বাংলার রেনেসাঁসের নায়করা যে ব্রিটিশ শাসনের পূর্ণ সমর্থক ছিলেন, এই বাস্তব সত্যটি আজ বাংলার রেনেসাঁসকে 'মহান' বলে সিলমোহর দেগে দেওয়া বুদ্ধিজীবীরাও স্বীকার করেন। এইসব রেনেসাঁসপন্থীরা নিজেদের বক্তব্যের সমর্থনে যে যুক্তি হাজির করেন, তা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মোটামুটি একই রকম। বক্তব্যের মূল সুর হলো ব্রিটিশ শাসনের আগে ভারতবর্ষের সমাজ প্রগতির গতি ছিল রুদ্ধ, অনড়। উন্নততর সভ্যতার ধারক ও বাহক হিসেবে ব্রিটিশরা ভারতকে নিজেদের অধীনে রাখার ফলে ভারতের প্রাচীন সমাজের অচলতা সচল গতি পেয়েছিল। ব্রিটিশ শাসনে ভারতীয় সমাজ-প্রগতির বাস্তব ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অশোক রুদ্র ১৯৮১ তে 'Frontier' পত্রিকায় 'Reassessment of the 19th century' শিরোনামের এক প্রবন্ধে লিখেছিলেন, বাংলার রেনেসাঁস আন্দোলনের নায়করা সঠিকভাবেই আমাদের পুরোনো সামাজিক অবস্থাকে ভারতীয় সমাজের অগ্রগতির পথে প্রধান বাধা বলে চিহ্নিত করেছিলেন এবং এই বাধাকে অপসারণের জন্যেই তাঁরা ব্রিটিশ শাসনকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। অশোক রুদ্রর বক্তব্য মেনে নিলে বিগত দু-তিন শতক ধরে তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী শাসক ছিল, তাকেও তবে সমর্থন জানাতেই হয়। কারণ এই ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী অনুপ্রবেশই পুরোনো সমাজে অগ্রগতি আনতে সাহায্য করেছে। ব্রিটিশ শাসনকে সমর্থনই যদি প্রগতিশীলতার লক্ষণ হয়, তবে ব্রিটিশ শাসনের আরও বড় সমর্থক ও সহায়ক বিশ্বাসঘাতক মিরজাফর, উমিচাঁদ, জগৎ শেঠরা নিশ্চয়ই অশোক রুদ্রের চোখে আরও বড় প্রগতিশীল ছিলেন।

মানিক মুখোপাধ্যায় 'পথিকৃৎ' পত্রিকায় '৮৪ তে লেখা 'ভারতীয় রেনেসাঁ ও রামমোহন' প্রবন্ধে মত প্রকাশ করেছেন, ব্রিটিশ শাসনে যখন ভারত ছিল, তখন ব্রিটিশ বাণিজ্যিক পুঁজির একটা প্রগতিশীল ভূমিকা ছিল। ওরা চেয়েছিল এদেশের রাজা-জমিদার ইত্যাদি সামন্ত প্রভুদের নিয়ন্ত্রিত সমাজ ব্যবস্থার উচ্ছেদ ঘটিয়ে পরিবর্তে ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকে তাদের পুঁজিকে আকর্ষিত করতে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশের স্বার্থেই সমাজ-প্রগতিকে গতিশীল করতে। সমাজ-প্রগতির জন্যেও ব্রিটিশ শাসকদের কাছে জরুরি হয়ে পড়েছিল সামন্ততন্ত্রের উচ্ছেদের। ফলে ব্রিটিশ বাণিজ্যিক পুঁজি এবং ভারতীয় বাণিজ্যিক পুঁজি ভারতীয় সমাজের অগ্রগতির প্রধান বাধা ভারতীয় সামন্ত প্রভুদের শাসনতন্ত্রের উচ্ছেদের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। এই সময় ব্রিটিশ পুঁজিবাদের প্রতি সমর্থনকে তাই বলতে হবে প্রগতিশীলতা। মানিক মুখোপাধ্যায়ের মতো প্রগতিশীল বলে পরিচিত বুদ্ধিজীবী কী করে এমন নিপাট মিথ্যে লিখলেন। তাঁর কি এই ঐতিহাসিক সত্যটুকু জানা নেই - ব্রিটিশ সরকার রাজা-জমিদার ইত্যাদি সামন্ত প্রভুদের নিয়ন্ত্রিত সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে দিতে চায়নি, বরং গড়ে তুলতেই চেয়েছিল? চাওয়ার কারণ, উপনিবেশ রক্ষার স্বার্থে বিশাল সেনাবাহিনী ইংলন্ড থেকে না এনে এখানকার রাজা-জমিদারদের মতো সামন্ত প্রভুদের ব্রিটিশ সমর্থক করে তাদেরকেই উপনিবেশ রক্ষার কাজে নিয়োজিত করা। আমার এই বক্তব্যের সমর্থনে লর্ড বেনটিড-এর বক্তব্য থেকে আর কে মুখার্জির উদ্ধৃতি তুলে দেওয়া 'Rise and Fall of the East India Company' বইটির ২৩৮ পৃষ্ঠা থেকে দুটি মাত্র লাইন হাজির করছি। কর্নওয়ালিশের 'চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত'-এর প্রায় চল্লিশ বছর পর লর্ড বেনটিঙ্ক চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ব্রিটিশ শাসনের স্বার্থে ভারতে কতটা প্রয়োজনীয় ছিল সে কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, "ব্যাপক গণবিক্ষোভ বা বিপ্লবের বিরুদ্ধে নিরাপত্তার প্রশ্নে এই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের এক বিশাল সুবিধা রয়েছে। এই বন্দোবস্তের ফলে যে বিপুল সংখ্যক জমিদার তৈরি হয়েছে, তারা নিজ স্বার্থেই ব্রিটিশ প্রাধান্য বজার রাখতে উৎসাহী, ব্যাপক জনগণের উপরও তাদের সম্পূর্ণ আধিপত্য রয়েছে।"

উপরের কথাগুলো থেকে এবং পূর্ববর্তী আলোচনা থেকে পাঠক-পাঠিকাদের কাছে নিশ্চয়ই স্পষ্টতর হয়েছে, ব্রিটিশ সরকার যেমন সামন্ত প্রভুদের উচ্ছেন চায়নি, তেমনই চায়নি দেশীয় পুঁজিকে ব্যবসা-বাণিজ্যে আকর্ষিত করতে। ফলে, ব্যবসা-বাণিজ্য বিকাশের স্বার্থে সমাজকে গতিশীল করতে ব্রিটিশ সরকার সচেষ্ট হয়েছিল - এই কুযুক্তিও কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের সুদীর্ঘ সময়ের অভিভাবক রজনীপাম দত্ত তাঁর 'India Today' গ্রন্থের ২৮২ পৃষ্ঠায় ব্রিটিশ সরকারের একনিষ্ঠ সমর্থক রামমোহন রায়কে 'ভারতীয় জাতীয়তাবাদের জনক' বলে চিহ্নিত করেছেন। জানি না রজনীপামের দৃষ্টিতে জাতীয়তাবাদের অর্থ কী? 'জাতীয়' কথার অর্থ জাতি সম্বন্ধীয়। রামমোহন কোন জাতি সম্বন্ধীয় উপলব্ধি থেকে ব্রিটিশ প্রভুত্ব এবং ভারতের জনগণের পরাধীনতাকে সোচ্চারে সমর্থন জানিয়ে ছিলেন? তিনি ধনী জাতীয় মানুষ সম্পর্কিত উপলব্ধি থেকে, ধনী জাতীয় মানুষদের স্বার্থ চিন্তা থেকে বৈদেশিক প্রভুত্বকে স্বীকার করে নিয়েছিলেন বলেই 'ধনী ভারতীয়দের জাতীয়তাবাদের জনক' ছিলেন - এই কথাটি বলতে রজনীপামের দ্বিধা কেন? আর কবে এইসব বৃদ্ধিজীবীরা স্পষ্ট ভাষায় 'গোলাপ'কে 'গোলাপ', আর 'কোদাল'কে 'কোদাল' বলবেন? ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার, মার্কসবাদী বুদ্ধিজীবী নরহরি কবিরাজ, মার্কসবাদীদের একদা অভিভাবক রজনীপাম দত্ত, বুদ্ধিজীবী শিবনারায়ণ রায়, অশোক রুদ্র ঘুরিয়ে ফিরিয়ে উনিশ শতকের রেনেসাঁসকেই সমর্থন করেছেন। যদুনাথ তো রেনেসাঁসকে "The greatest gift of English" বলেই ঘোষণা করেছেন। তাঁদের এমনতর স্বীকৃতির মধ্যে যুক্তির কোনও স্থান ছিল না। যুক্তির নিরিখে এইসব বিখ্যাতদের বক্তব্য নিতান্তই অসার হয়ে পড়ে। রেনেসাঁসের সময় থেকে আজ পর্যন্ত বঙ্গীয় রেনেসাঁস যুগের পুরোধা রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, মাইকেল মধুসূদন, বিবেকানন্দ, কেশব সেন, ডিরোজিও প্রমুখ উনবিংশ শতকের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নেতাদের যে মূল্যায়ন হয়ে আসছে তার মধ্যে যুক্তিবিচার বাস্তবিকই স্থান পায়নি। ব্যক্তিপূজার ফলে এঁরা অনেকেই আজ এমনই এক কিংবদন্তি জগতের মহানায়কের রূপ পেয়েছেন যে এঁদের সীমাবদ্ধতা, নেতিবাচক দিক, ভ্রান্ত চিন্তা, এমনকী দেশের জনগণের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার মতো দিকগুলোর প্রতিও বর্তমানের মূল্যায়নকারীরা কিছু বলতে ভয় পান। ফলে জনসমর্থন সচেতন এইসব সমালোচকদের কৃপায় সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এইসব নায়ক চরিত্রগুলোর মূল্যায়ন হয়ে দাঁড়িয়েছে ভ্রান্ত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। রেনেসাঁস যুগের নায়কেরা কেউই তাঁদের সীমাবদ্ধতার গণ্ডি ভেঙে বেরিয়ে এসে বাস্তবিকই 'মহান' হয়ে উঠতে পারেননি। বাস্তবপক্ষে তাঁদের এই সীমাবদ্ধতার জন্যই তাঁদের অসাধারণ গুণাবলি ব্যাপক নিপীড়িত জনগণের মুক্তির পথে কোনও ইতিবাচক ভূমিকা গ্রহণ করেনি। তাঁদের এই রেনেসাঁস নামক সাংস্কৃতিক আন্দোলন ছিল স্পষ্টতই সংখ্যালঘু কিছু মানুষের জন্য তাদেরই মধ্যে সীমাবদ্ধ এক খণ্ডিত ও আধুনিকতার প্রহসনে আবদ্ধ আন্দোলন।

- 'সংস্কৃতি: সংঘর্ষ ও নির্মাণ', প্রবীর ঘোষ


Comments

Popular posts from this blog

চাড্ডিগণ [এক]

পাকিস্তান ও ইজরায়েল

মুস্তারেবিন