রিগোবার্তা মেনচু

 

কুইচি গোত্রীয় রিগোবার্তা মেনচু জন্মেছিলেন গুয়াতেমালার উত্তর-পশ্চিমের এল কুইচি প্রদেশে চাহুল শহরের কাছাকাছি চিমেল গ্রামে, ১৯৫৯ সালে হতদরিদ্র কৃষকের ঘরে। তারা ছিলেন ৯ ভাই-বোন, তার অবস্থান ছিল ষষ্ঠ। এখান থেকে চব্বিশ মাইল দক্ষিণে প্রাদেশিক রাজধানী উসপানতান শহর। অঞ্চলটি পর্বতশঙ্কুল উচ্চভূমি বিধায় স্পেনীয় ভাষায় এটাকে বলা হয় 'আলতিপালানো'। শিশু বয়সেই তার হাতেখড়ি হয় কৃষিকাজে, বাবার চিলতে একখণ্ড জমিতে। কচি হাতে সেখানে তিনি তুলতেন ভুট্টা, শিম। সামান্য ঐ জমিটুকু পরিবারের খাদ্য জোগানোর পক্ষে ছিল নিতান্তই অপ্রতুল। দিনমজুরিতেও দিন চলতো না। দারিদ্র সীমাহীন; অপুষ্টি, অনাহার, মৃত্যু নিত্যসঙ্গী। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাই অবাস্তব। আপন গোত্রীয় সংস্কৃতি ছিল প্রচলিত শ্বেতাঙ্গ শিক্ষার বিরুদ্ধে। কাজ আর আহারের সন্ধানে গোটা পরিবার বাধ্য হয়ে পাড়ি জমায় আরও দক্ষিণে প্রশান্ত মহাসাগরের কোলঘেঁষা উপকূলবর্তী অঞ্চলে; যেখানে রয়েছে বিশাল বিশাল ফিনকা (কৃষি খামার) - কফি, তুলা, ইক্ষুর বাগিচা, শত সহস্র একর জুড়ে। যেগুলোর মালিক স্প্যানিশ, ইংরেজ, জার্মান, মার্কিন শ্বেতাঙ্গ ও লাডিনো ভূস্বামীরা। বাবা-মা ও ভাইবোনদের সঙ্গে মেনচু তখন পুরাপুরি কৃষি মজুর। কাজ করতেন শ্বেতাঙ্গ ভূস্বামীদের কফি ও তুলার ক্ষেতে, কখনও ইক্ষুর খামারে। ১৩-১৪ বছর বয়সে তাকে বাধ্য হয়ে যেতে হয় রাজধানী শহরে ধনী ভূস্বামীর গৃহে চাকরানীর কাজ করতে। ২০ বছর বয়স অবধি গোত্রীয় ভাষা কুইচি ছাড়া তিনি জানতেন না অন্য কোনো ভাষা। আপন প্রচেষ্টায় তিনি বলতে ও বুঝতে শেখেন স্প্যানিশ ভাষা, কিন্তু লিখতে কিংবা পড়তে শেখেন নি তখনও। ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত হয় তার আত্মজীবনীমূলক বই 'I, Rigoberta Menchu', স্প্যানিশ ভাষায়। বঞ্চিত, নিপীড়িত, নির্মূলিত আদিবাসী জীবনের অপূর্ব এক আলেখ্য। সংখ্যালঘিষ্ঠ লাডিনোদের দ্বারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আদিবাসী মায়ারা কিভাবে অত্যাচার ও খুন-জখমের শিকার হয়; তাদের শাসন-শোষণে, নির্বিচার হত্যাযজ্ঞের মধ্যে আদিবাসীরা কিভাবে টিকে থাকে তারই সামগ্রিক চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি বইটিতে। অল্পদিনের মধ্যে বইটি অনূদিত হয় ইংরেজিসহ বহু ভাষায়। গোটা পৃথিবীর সামনে পরিচিত হয়ে ওঠেন রিগোবার্তা মেনচু ২৪ বছর বয়সে। তিরিশের কোটায় পা রাখার আগেই তিনি পরিণত হন বিশ্বের সকল আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংগ্রামের মূর্ত প্রতীকে। গ্রন্থাকারে এটি রূপলাভ করে মার্কিন নৃতত্ত্ববিদ এলিজাবেথ নাগোস ডেব্রের সম্পাদনায়, যিনি রিগোবার্তার কাহিনী-বক্তব্যাদি টেপ রেকর্ডারে ধারণ করেন প্যারিসে, তার ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার গ্রহণের মাধ্যমে। ততোদিনে তার জীবনে ঘটে গেছে অনেক বিপর্যয়কারী ঘটনা। বাবার অনুসারী হয়ে তিনি জড়িয়ে গেছেন আদিবাসীদের অধিকার সংরক্ষণের আন্দোলনে। নিয়মতান্ত্রিকতার গৎবাঁধা স্তর ছাড়িয়ে সে আন্দোলন ততোদিনে পৌঁছে গেছে সশস্ত্র সংগ্রামের পর্যায়ে। গুয়াতেমালান সরকার আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ানদের 'সভ্য' বানানোর শ্লোগানের আড়ালে আদিবাসী নিশ্চিহ্নকরণ ও পোড়ামাটির নীতি অবলম্বন করেছিল ব্যাপক মাত্রায়।

১৯৭০ ও ৮০'র দশকে তার গ্রামটিকে জ্বালিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয় গুয়াতেমালান সেনাবাহিনী একাধিকবার এবং সেটার বাসিন্দা সংখ্যা ৪০০ থেকে কমে দাঁড়ায় মাত্র ১২ তে।

১৬ বছর বয়সী ভাই পেত্রোসিনিওকে একদিন অপহরণ করে নিয়ে যায় সরকারী বাহিনীর সৈন্যরা। জীবন্ত অবস্থায় তার শরীরের চামড়া ও পায়ের তলার মাংস কেটে নেয় তারা। আরও জনা তিরিশেক পুরুষ ও নারীর সঙ্গে তাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারে। গেরিলা সন্দেহে পৈশাচিক হত্যাকান্ডটি তারা ঘটায় ২৪শে সেপ্টেম্বর, ১৯৭৯ সালে।

১৯৮০ সালের ১লা জানুয়ারি তার বাবা কৃষক সমিতির সঙ্গীদের নিয়ে যান গুয়াতেমালা সিটিতে, স্পেনীয় দূতাবাসের সামনে। উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের দুর্দশার চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা। সমাবেশ শুরু হওয়ার আগেই শুরু হয়ে যায় পুলিশী আক্রমণ। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে তার বাবা আশ্রয় নেন দূতাবাসের মধ্যে। সরকারী বাহিনী ঘেরাও দিয়ে পুরো বিল্ডিংটাতে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে মারে সবাইকে।

১৯শে এপ্রিল, ১৯৮০ সালে মেনচুর ৪৩ বছর বয়সী মাকে টেনে হিচড়ে ধরে নিয়ে যায় সৈন্যরা। সেনা ব্যারাকে বন্দী অবস্থায় সেনা অফিসাররা তাকে ধর্ষণ করে পালাক্রমে। নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়ে জীবস্তু অবস্থায় কেটে নেয়া হয় তার শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ। মুমূর্ষু অবস্থায় সৈন্যরা তাকে ফেলে রাখে গাছতলায় সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায়। সেখানেই তার মৃত্যু ঘটে সৈন্যদের প্রহরায় থেকে, যেন ভার সাহায্যে কেউ এগিয়ে আসতে না পারে। মৃত্যুর পর তার মরদেহের মুখে সৈন্যরা প্রস্রাব করেছিল।

আরেক ভাই ভিক্তরকে সৈন্যরা গুলি করে হত্যা করে ৭ই মার্চ ১৯৮৩ সালে, যার বউ মারিয়াকে অপহরণ ও ধর্ষণ শেষে জবাই করে হত্যা করা হয় ১৯৮০ সালের গোড়ার দিকে। ফিনকাতে থাকতে অপুষ্টি, অনাহার ও ছিটানো কীটনাশকের বিষক্রিয়ায় মারা যায় তার দু'টি ভাই।

তার অন্তরঙ্গ বান্ধবী পেত্রোনা জোনা ছিল ৩ বছরের মেয়ে ও ২ বছরের ছেলের মা। পেত্রোনা স্বামীসহ বসবাদ ও কাজ করতো লাডিনো ভূস্বামী গার্সিয়াদের ফিনকাতে। ভূস্বামীর ছেলে কার্লোস গার্সিয়া পেত্রোনাকে তার রক্ষিতা হওয়ার প্রস্তাব দিয়ে উত্যক্ত করতো প্রায়শই। এ প্রস্তাবে সম্মত না হওয়ায় বাপের দেহরক্ষী পাঠিয়ে পেত্রেনাকে সে খুন করায় দা দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে, দেহটাকে তারা গুনে গুনে ২৫ টুকরো করে। ঘটনাটা সে ঘটায় দিনে-দুপুরে পেত্রোনার কুটিরে, ছোট সন্তানটি যখন ছিল তার পিঠে। দায়ের কোপে শিশুটির হাতের আঙ্গুল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, অন্য সন্তানটি ভয়ে চিৎকার করে ছুটে পালিয়ে বাঁচে। পেত্রোনার আর্তচিৎকারে আশপাশে কর্মরতদের কেউ সাহায্যে এগিয়ে আসেনি খুন আর কর্মচ্যুত হওয়ার ভয়ে।

মেনচুর বয়স তখন ২১। আত্মগোপনে থেকেও চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বাধ্য হয়ে তিনি সীমান্ত পেরিয়ে চলে যান মেক্সিকোতে। নির্বাসনে তার কেটে যায় দীর্ঘ ১৩টি বছর, যে সময়টা তিনি নিয়োজিত থাকেন স্বদেশীয় উদ্বাস্তুদের সেবায়, নিহত এবং 'অদৃশ্য' হয়ে যাওয়াদের বিধবা ও শিশুদের জন্য আশ্রয় কেন্দ্র গড়ে তোলার কাজে। আপন দেশের জনগণের বিরুদ্ধে গুয়াতেমালার সরকার রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যে জাতিগত নির্মূলকরণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে সুপরিকল্পিতভাবে সে সম্পর্কে জাতিসংঘ সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনকে সচেতন করে তুলতে তিনি বিশ্বব্যাপী প্রচার আন্দোলন সংগঠিত করতে থাকেন। ১৯৮৮ সালে তিনি দেশে ফিরে গেলে সরকার তাকে গ্রেফতার করলেও আন্তজাতিক চাপে তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৯২ সালে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। একই বছরে তিনি গড়ে তোলেন রিগোনার্তা মেনচু ফাউন্ডেশন, বিশ্বের সকল আদিবাসীদের অধিকার আদায় ও সংরক্ষণের কর্মকাণ্ড পরিচালনার লক্ষ্যে।

১৪৯২ সালের ১২ই অক্টোবর পশ্চিম গোলার্ধের মাটিতে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের পা রাখার পর থেকে যে ইতিহাস সেখানে সৃষ্টি হয় তারই পরতে পরতে মিশে আছে সেখানকার আদি বাসিন্দাদের রক্ত আর হাহাকার। কলম্বাস কর্তৃক স্পেনের রাজা-রাণীর আশীর্বাদ বহন করে আনার সুবাদে নব আবিষ্কৃত ভূভাগের বিশাল অঞ্চলের দখল চলে যায় স্পেনের ভাগে। স্পেনের অনুবর্তী হয়ে সেখানে আগমন ঘটে পর্তুগীজ, ফরাসী, ইংরেজ ইত্যাদি ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গ জাতির। কলম্বাসের হাতে কিউবা স্পেনের দখলে যায় ১৪৯২ সালে, পরবর্তী ৪০ বছরের মধ্যে স্পেন দখল করে নেয় মেক্সিকো সহ মধ্য ও ব্রাজিল বাদে সমগ্র দক্ষিণ আমেরিকা। ব্রাজিল পর্তুগালের দখলে যায় ১৫০০ সালে। মেক্সিকো স্পেনের দ্বারা দখল হয় ১৫২১ তে, গুয়াতেমালা ১৫২৪ সালে, নিকারাগুয়া ১৫২৩ তে। মেক্সিকোর বিস্তার তখন ছিল বর্তমানের নিউ মেক্সিকো, আরিজোনা, টেক্সাস হয়ে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত। স্পেন সমগ্র ভূভাগের নাম দিয়েছিল নিউ স্পেন। বর্তমানের গুয়াতেমালার বিস্তার তখন ছিল এল সালভাদর, হন্ডুরাস ও নিকারাগুয়া হয়ে কোস্টারিকা ও পানামা পেরিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার কলম্বিয়ার সীমান্ত পর্যন্ত। মায়া জনগোষ্ঠীর তোলতেক ভাষায় গুয়াতেমালা শব্দের অর্থ 'বৃক্ষরাজি শোভিত দেশ'। অঞ্চলটি স্পেনের দখলে থাকে টানা ৩০০ বছর, যা পরবর্তীতে বিভক্ত হয়ে পরিণত হয় ৬টি দেশে। কিন্তু তথাকথিত স্বাধীনতা থেকে যায় স্প্যানিশ শ্বেতাঙ্গ ও তাদের শংকর বংশধরদের হাতে। জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার খণ্ডকালীন এক হিসাব মতে বিংশ শতাব্দীর শেষ তিন দশকে গুয়াতেমালায় সরকারী বাহিনীর হাতে খুন হয় দেড় লক্ষ আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ান নারী-পুরুষ ও শিশু। ৮০'র দশকেই খুন করা হয় ৫০ হাজারের মতো আদিবাসীকে। ৪৫০ টিরও বেশি আদিবাসী গ্রাম ও বসতি পুড়িয়ে ধুলিসাৎ করে দেয় সরকারী বাহিনী। শস্যের ক্ষেত জ্বালিয়ে দেয়া নৈমিত্তিক ঘটনা। এ পর্যন্ত দু'শরও বেশী গণকবরের অস্তিত্ব মিলেছে দেশটিতে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় চলেছে এসব নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। মার্কিনী নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালিত না হলে ঘটে চলে সামরিক অভ্যুত্থান, আবির্ভূত হয় স্বৈরশাসক জেনারেলরা।

১৯৮২-৮৩ তে জেনারেল এফেইন রিওস মন্ট ঘোষণা দিয়েছিলেন "কে আদিবাসী আর কে গেরিলা এটা যখন আমরা জানি না তখন যেকোনো ৫০ জনকে খুন করলে তাদের মধ্যে ১০ জনও যদি গেরিলা থাকে তাহলে অপারেশন আমাদের সফল হয়েছে বলে গণ্য করতে হবে।"

জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় এবং স্পেন ও নরওয়ের উদ্যোগে গুয়াতেমালার বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ১৯৯৬ সালে, যেটির আওতায় গেরিলারা অস্ত্র সমর্পণ করে এবং সরকার জমিসহ কতিপয় সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে আদিবাসীদের।


Comments

Popular posts from this blog

চাড্ডিগণ [এক]

মুস্তারেবিন

পাকিস্তান ও ইজরায়েল