চাড্ডিগণ [তিন]

 

"হিন্দুদের মধ্যে একটা ধারণা আছে-বেদে সব আছে। আজকের আধুনিক বিজ্ঞান যা কিছু আবিষ্কার করছে, তার সবই লিপিবদ্ধ রয়েছে বেদ-এ। বিদেশি শক্তি বেদ নিয়ে গিয়ে তার অর্থ পাঠোদ্ধার করে বিজ্ঞানের নিত্য নতুন আবিষ্কার করে চলেছে। আসুন, দেখি বেদে ঠিক কী আছে।

বেদ-চারটি। ঋক্, সাম, যজু, অথর্ব। 

ঋকবেদ - এতে আছে দেবতাদের উদ্দেশে রচিত নানা স্তোত্র। ঋকবেদের পাঁচটি শাখার নাম আমরা জানতে পেরেছি। (১) শাকল (২) বাস্কল (৩) আশ্বলায়ন (৪) সাংখ্যায়ন (৫) মাণ্ডুক। 

বর্তমানে ঋকবেদের শাকল শাখাটিই শুধু টিকে আছে। এখন যে ঋকবেদ পাচ্ছি, তাতে আছে ১০২৮টি শূক্ত বা অধ্যায়। ১০২৮টি শূক্তে দশ হাজারের উপর শ্লোক রয়েছে। শ্লোকগুলোতে দেবতার গুণগান ও তাঁদের করুণা ভিক্ষা করা হয়েছে। এই দেবতারা তিন শ্রেণির। স্বর্গের দেবতা, যাঁদের মধ্যে প্রধান মিত্র, পুষা, বিষ্ণু, ঊষা, আদিত্যগণ। আকাশের দেবতা, যথা- ইন্দ্র, রুদ্র, বায়ু, পর্জন্য ও মরুদগণ। পৃথিবীর দেবতা, যথা- অগ্নি, সোম, পৃথিবী ইত্যাদি। ঋকবেদের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, প্রাকৃতিক শক্তিগুলোকে যেমন দেবত্ব আরোপ করেছিল, তেমনই মানবত্ব আরোপেরও প্রয়াস ছিল। যেমন- ঊষা এক সুন্দরী যুবতী, যে তার প্রেমিকের কাছে নিজের স্তন উন্মুক্ত করে দেয়। অগ্নি রক্তাভ চুলের এক ব্রাহ্মণ, যার পরনে পুরোহিতের পোশাক।

সামবেদ - সামবেদকে বলা যায় ঋকবেদ-এ রচিত স্তোত্রগুলোর স্বরলিপি গ্রন্থ। এতে স্তোত্রগুলোর গায়নবিধি ও আবৃত্তিবিধি তুলে ধরা হয়েছে। সামবেদের মোট তিনটি শাখা। (১) কৌথুম (২) রাণায়নীয় (৩) জৈমিনীয় বা তালবকার।

সামবেদের কৌথুম শাখাই বেশি প্রচলিত। সাম শব্দের অর্থ হলো গান। সামবেদের ঋক্ বা স্তবকগুলোকে 'যোনি' আখ্যা দেওয়া হয়। যজ্ঞবেদিকেও 'যোনি' আখ্যা দেওয়া হয়। পুরুষ ও প্রকৃতিতত্ত্ব এবং জাদুবিশ্বাসের সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে 'যোনি' শব্দটির ব্যবহার যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।

যজুর্বেদ - এতে আছে নানা যাগযজ্ঞের বিস্তৃত নিয়মাবলি, পদ্ধতি ও অনুশাসন। যজুর্বেদ দু'ভাগে বিভক্ত। (১) শুক্ল (২) কৃষ্ণ। 

শুক্ল যজুর্বেদের একটিমাত্র শাখাই আমরা পেয়েছি। শাখাটির নাম বাজসনেয়। কৃষ্ণ যজুর্বেদের চারটি শাখা। (১) কাঠক সংহিতা, (২) কপিষ্টল-কঠ-সংহিতা, (৩) তৈত্তিরীয় সংহিতা বা আপস্তম্ব সংহিতা (৪) মৈত্রায়ণী সংহিতা। যজুর্বেদের মন্ত্রগুলো স্থানবিশেষে শ্লোকে ও স্থান বিশেষে গদ্যে রচিত।

অথর্ববেদ - প্রাচীনত্বে ঋকবেদের প্রায় সমকালীন। অথর্ববেদের প্রাচীন নাম 'অথর্বঙ্গিরস'। অথর্ববেদের দু'টি শাখার খোঁজ আমরা পেয়েছি। (১) শৌনক (২) পৈপ্পলাদ। অথর্ববেদে আছে তুকতাক, ঝাড়ফুঁক, মারণ-উচাটন, গৃহবন্ধন, গ্রামবন্ধন, বশীকরণ ইত্যাদির প্রয়োগ পদ্ধতি। অথর্ববেদে আছে নারীর সুপ্রসবের জন্য মন্ত্র, জ্বর সারাবার মন্ত্র, গরুর রোগ সারাবার মন্ত্র, রাক্ষস ও পিশাচ বিনাশের মন্ত্র, বাত-পিত্ত-শ্লেষ্মা সারাবার মন্ত্র, হৃদরোগ ও কুষ্ঠ সারাবার মন্ত্র, শত্রুনাশ, দস্যুনাশ, দীর্ঘায়ু লাভের মন্ত্র, বিবাদে জয়ের মন্ত্র, ক্রিমিরোগের শান্তি-মন্ত্র, শত্রু সেনা সম্মোহন পদ্ধতি, যক্ষ্মা নাশ মন্ত্র, শত্রু পত্নীকে বন্ধ্যা করার মন্ত্র ইত্যাদি। পাশাপাশি অথর্ববেদে বিভিন্ন রোগ সারাতে নানা রকম গাছ-গাছড়া ও ধাতুর ব্যবহারের কথা আমরা পেলাম, পেলাম রসায়ন শাস্ত্র। এই বেদে আছে রোগ চালান করে দেওয়ার জন্য রোগটির কাছে অথবা অপদেবতা বা দেবতার কাছে প্রার্থনা। অথর্ববেদ 'যোগ-দর্শন' বা 'তন্ত্র-দর্শন'-এর মূল উৎস, যা আগাপাশতলা কুসংস্কার ও ভ্রান্ত বিশ্বাস বই কিছুই নয়।

ঋক্, সাম, যজুও শেষ পর্যন্ত মোটাদাগের কুসংস্কারই।

বেদের ব্যাখ্যা দিতে তৈরি হয়েছিল ব্রাহ্মণ গ্রন্থসমূহ। এইসব গ্রন্থে আছে নানা যজ্ঞের কথা এবং যজ্ঞকে মহাজাগতিক শক্তি হিসেবে গণ্য করার কথা।"

- 'প্রবাদ-সংস্কার-কুসংস্কার (১ম)', প্রবীর ঘোষ 

............................................................................................

"তর্কবিদ্যা অর্থাৎ ন্যায় দর্শনের সঙ্গে সমকালীন যুক্তিবাদী দর্শনের একটা বড় রকমের পার্থক্য রয়েছে। ভারতীয় ভাববাদীরা বেদ ও বিভিন্ন ধর্মশাস্ত্রকে অভ্রান্ত, স্বতঃপ্রমাণ ধরে নিয়ে তারপর বেদ ও ধর্মশাস্ত্রের নানা বক্তব্য নিয়ে নিজেদের মতো করে টীকা বা ব্যাখ্যা হাজির করেন। বিভিন্ন ব্যাখ্যাকারদের মধ্যে মত পার্থক্য থাকে। সেই পার্থক্যের কারণে ব্যাখ্যাকারদের মধ্যে যুক্তি-তর্কের লড়াই চলে। বেদ ও ধর্মশাস্ত্রকে অভ্রান্ত ধরে নিয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যাকার বা টীকাকারদের এই তর্ককেই 'তর্কবিদ্যা' হিসেবে ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে প্রধান গৌরবের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু 'তর্কবিদ্যা' কখনই 'যুক্তিবাদ' হয়ে ওঠেনি। কারণ, প্রথমেই ধর্মশাস্ত্র বা বৈদিক সাহিত্যকে অভ্রান্ত ধরে নেওয়ার পিছনে কোনও যুক্তি নেই।"

- অলৌকিক নয়, লৌকিক (৫ম)

..............................................................................................

"ছেলেবেলায় পড়েছি, হর্ষবর্ধন বিশাল মাপের 'দানবীর' ছিলেন। চার বছর অন্তর কনৌজের ধর্মমেলায় যেতেন। সেখানে রাজকোষ উজাড় করে দান করতেন। শেষে পরিধানের পোশাকটি দান করে, বোনের দেওয়া বস্ত্র পরে প্রাসাদে ফিরতেন। চার বছরের মধ্যে আবার তাঁর শূন্য রাজকোষ ভরে উঠতো কোন ম্যাজিকে? যাদের দারিদ্র ঘোচাতে দান করা, তাদের শুষেই কী আবার রাজকোষ পূর্ণ করার খেলা খেলতেন না 'দানবীর' সম্রাট?"

- অলৌকিক নয়, লৌকিক (৫ম)

.............................................................................................

"....ব্রাহ্মণ্য উপাসনা ধর্মের সঙ্গে জ্যোতিষ শাস্ত্রও সেন রাজশক্তির পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল। সেন যুগে যেসব গ্রন্থ রচিত হয়েছিল, তার একটা বিরাট অংশই ছিল জ্যোতিষ শাস্ত্র। সেন যুগ এই বঙ্গে কুসংস্কারাচ্ছন্ন যুগের সূচনা করে।...."

- 'জ্যোতিষীর কফিনে শেষ পেরেক', প্রবীর ঘোষ

...............................................................................................

"....আর্যভটের সমসাময়িক ছিলেন বরাহমিহির। জন্ম ৫০৫ খ্রিস্টাব্দে উজ্জয়িনীতে। ভারতীয় জ্যোতিষীদের কাছে বরাহমিহির-ই ভারতীয় জ্যোতিষ শাস্ত্রের জনক। তিনি-ই ভারতীয় ফলিত জ্যোতিষের (গ্রহ-নক্ষত্রের সঙ্গে ভাগ্য যুক্ত তত্ত্ব) আদলটি তৈরি করেন। এবং কোন গ্রহদোষ কাটাতে কোন রত্ন ধারণ করতে হবে - তারও বিধান দিয়ে যান। বরাহমিহির-ই ভারতীয় জ্যোতিষীদের মধ্যে প্রথম বর্ণময় ও কিংবদন্তি চরিত্র। কিংবদন্তি অনুসারে বরাহমিহির ছিলেন বিক্রমাদিত্যের অর্থাৎ দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের 'নবরত্ন' সভার অন্যতম রত্ন বা প্রতিভা। কিন্তু বিক্রমাদিত্যের শাসনকালের শুরু ৩৮০ খ্রিস্টাব্দে। মারা যান ৪১২ বা ৪১৩ খ্রিস্টাব্দে। বিক্রমাদিত্যের কালে বরাহমিহিরের জন্ম-ই হয়নি। সুতরাং বিক্রমাদিত্যের সভাপণ্ডিত হওয়ার কোনও সুযোগ-ই বরাহমিহিরের ছিল না। বরাহমিহির কিংবদন্তি চরিত্র হয়ে ওঠার পর ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের জ্যোতিষীরা বিভিন্ন আঞ্চলিক কিংবদন্তি চরিত্রের সঙ্গে তাঁর নানা কল্পকাহিনি জুড়ে দিয়েছিল। এমন করার কারণ, আঞ্চলিক জ্যোতিষীদের মর্যাদা বৃদ্ধি করা। বরাহমিহিরের সময়ে ফলিত জ্যোতিষকে 'যবন শাস্ত্র' বলা হতো। আর্য জাদু-পুরোহিত বা ঋষিরা ফলিত জ্যোতিষের প্রতি সামান্যতম শ্রদ্ধা পোষণ করতো না। বরং যথেষ্ট অবজ্ঞার চোখে দেখতো। ফলে উচ্চ বর্ণের নাগরিকরা জ্যোতিষদের বা ভাগ্য গণনাকারীদের সামান্যতম মর্যাদার চোখে দেখতেন না। আলেকজান্ডারের আগমনকাল থেকে ৬ষ্ঠ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ফলিত জ্যোতিষ এদেশে টিম টিম করে টিকিয়ে রেখেছিল আগত গ্রিকদের একটি সম্প্রদায়। পেট চালাতে তারা মানুষের ভাগ্য গণনার নাম করে রোজগার করতো। এই ভাগ্য গণক সম্প্রদায় সমাজে তেমন পাত্তা তো পেত-ই না, বরং কিছুটা পতিত ছিল। ভাগ্য গণকদের জাতে তুলতে বরাহমিহির-ই প্রথম সচেষ্ট হয়েছিলেন। তাঁর রচিত 'বৃহৎ সংহিতা'য় আছে-

মেচ্ছা হি যবনাস্তেষু সম্যক শাস্ত্রমিদং স্থিতম্।

ঋষিবৎ তেহপি পূজ্যন্তে কিম্পূর্ণদৈববিদ দ্বিজঃ।।

অর্থাৎ -

যবনরা যদিও ম্লেচ্ছ, তবুও তাঁরা ফলিত শাস্ত্র ভালোমতো জানে। তারা ফলিত শাস্ত্রবিদদের ঋষির মতো পুজো করে। তবে এখানে আমরা দৈববিদরা কেন পূজিত হবো না।।

'বৃহৎ সংহিতা'য় অনেক গ্রিক শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। তিনি 'ম্লেচ্ছ' বলতে গ্রিকভাষীদের বুঝিয়ে ছিলেন। তখন বিদেশীদের 'ম্লেচ্ছ' বলা হতো। বৃহৎ সংহিতায় বিভিন্ন রত্নের গুণ বর্ণনা করা হয়েছে। আছে রত্নের সঙ্গে গ্রহের সম্পর্কের কথা। এছাড়াও আছে বিভিন্ন ফুলের গন্ধের সুগন্ধি তৈরির পদ্ধতি। কিছু শিক্ষিত জ্যোতিষ বিশ্বাসীদের মতে বরাহমিহিরের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ 'পঞ্চসিদ্ধান্তিকা'। আর্যভট 'সিদ্ধান্ত জ্যোতিষ'-এর নানা মৌলিক ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন করেছিলেন - সে কথা আগেই বলা হয়েছে। 'পঞ্চসিদ্ধান্তিকা' হলো জ্যোতিষের পুরনো তত্ত্বগুলোতে আবার ফিরে যাওয়ার প্রয়াস। আর্যভটের হাজির করা পৃথিবীর আহ্নিক গতির মতে বরাহমিহির বিশ্বাস করতেন না। বিশ্বাস করতেন না তাঁর গ্রহণ সংক্রান্ত তত্ত্বকে। তারপরও ভারতীয়দের কাছে বরাহমিহির যতটা কিংবদন্তি; আর্যভট ততটাই অপরিচিত, উপেক্ষিত একটি নাম। এটা জাতি হিসেবে ভারতীয়দের অপদার্থতা।...."

- 'জ্যোতিষীর কফিনে শেষ পেরেক', প্রবীর ঘোষ

.............................................................................................

ষষ্ঠ শতকে হর্ষ একের পর এক হিন্দু মন্দির লুণ্ঠন করেছিলেন। তিনি মন্দির লুণ্ঠনের জন্য 'দেবোৎপাটননায়ক' নামে এক শ্রেণীর রাজকর্মচারী নিয়োগ করেছিলেন। তাই চাড্ডিদের মাহমুদ ও ঔরঙ্গজেবকে গালি দেয়ার সময় হর্ষের নামও উল্লেখ করা উচিত।

https://en.m.wikipedia.org/wiki/Harsha#:~:text=Harshavardhana%20(Sanskrit%3A%20%E0%A4%B9%E0%A4%B0%E0%A5%8D%E0%A4%B7%E0%A4%B5%E0%A4%B0%E0%A5%8D%E0%A4%A7%E0%A4%A8%3B%204,until%20his%20death%20in%20647.

গোটা হিন্দু যুগব্যাপী বীর-শৈব ও লিঙ্গায়েৎ সম্প্রদায়গুলো অত্যন্ত নিষ্ঠুরতার সঙ্গে বৌদ্ধ ও জৈন মন্দির এবং মঠের পুঁথি ধ্বংস করে গেছে।

সাম্প্রদায়িক ঐতিহাসিকরা আকবরের বিরুদ্ধে রাণা প্রতাপের যুদ্ধকে মুসলমানের বিরুদ্ধে হিন্দুদের যুদ্ধ বলে প্রচার করতে চাইলেও বাস্তব সত্য আদৌ তা নয়। আকবরের পক্ষে হিন্দু রাজপুত সেনার সংখ্যা ছিল চল্লিশ হাজার। সেনাপতি মান সিংহ ছিলেন রাজপুত। অপরপক্ষে রাণা প্রতাপের বাহিনীতে ছিল বিশাল সংখ্যায় পাঠান সৈন্য। সেনাপতি ছিলেন হাকিম খাঁ। এছাড়া তাজ খাঁর নেতৃত্বে ছিল আরেকটি পাঠান বাহিনী। দুই রাজার এই লড়াই কোনও সময়ই মুসলমান ও হিন্দুদের যুদ্ধ ছিল না। ছিল দুই রাজার মধ্যকার স্বার্থের লড়াই।

...............................................................................................

"আমাদের সমাজে জাতিভেদ প্রথার ফলে বিজ্ঞানে প্রকৃত বিকাশ সম্ভব হয়নি। তার কারণ, জাতিভেদ প্রথা অনুসারে কারিগরদের কাজটার দায়িত্ব ছিল নিচু জাতের মানুষের ওপর-বংশ পরম্পরায় এক একটা ছোট জাত এক এক রকম হাতের কাজে একান্তভাবেই নিযুক্ত ছিল। ফলে, কারিগরদের পক্ষে নানা রকম সূক্ষ্ম কাজ শেখা সম্ভব হয়েছিল, এ কথায় সন্দেহ নেই। কিন্তু তারই খাতিরে দেশকে দিতে হলো সাংঘাতিক রকমের বেশি মূল্য। অর্থাৎ কিনা, ওই ব্যবস্থার ফলে দেশের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছিল। সমাজে যাদের উপর ছিল জ্ঞানচর্চার ভার, সবরকম হাতের কাজের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক চুকে গেলো, আর কারিগরি কাজের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে তাদের কোনো সম্পর্ক রইলো না বলেই তাদের চেতনা থেকে এই প্রশ্নটি মুছে গেলো যে, একটা ঘটনা কেন ঘটে, কীভাবে ঘটে? একটি ঘটনার সাথে তার কারণের সম্পর্কটাকে এরা আর দেখতে পায় না। ফলে তাদের মন থেকে মরে যেতে লাগলো কৌতূহল, জ্ঞানের পিপাসা।...

একেই তো এদেশে একটা ঝোঁক ছিল কল্পনাবিলাসের প্রতি, সূক্ষ্ম দার্শনিক সমস্যা নিয়ে চুলচেরা বিচার করবার দিকে। তাই এইভাবে কারিগরদের অচ্ছুৎ করে রাখবার ফলে জ্ঞান চর্চার জীবনটা থেকে যখন কৌতূহল মরে যেতে লাগলো, তখন দেশটা যেন পরীক্ষামূলক আর অভিজ্ঞতামূলক বিজ্ঞানের কাছ থেকে বিদায় নিলো। তার মানে, এই সব কারণের জন্যে দেশ থেকে মুছে গেলো আসল বৈজ্ঞানিক উৎসাহটা। তাই এদেশে বয়েল বা দেকার্থ বা নিউটনের মতো কোনো বৈজ্ঞানিকের জন্মের আর সম্ভব হলো না এবং বৈজ্ঞানিক জগতের মানচিত্র থেকে বাদ পড়লো ভারতবর্ষ। প্রকৃতি বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণাটাই যেন এক নিন্দনীয় ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালো। এর জন্যে অবশ্য শংকরাচার্যর বেদান্ত দর্শনও অনেকখানি দায়ী। কেননা এই দার্শনিক মত অনুসারে প্রকৃতি বা পৃথিবী শেষ পর্যন্ত মায়া ও মিথ্যা।...

যে দেশের লোক জাতিভেদ প্রথায় জর্জরিত; যাদের মনের উপর বেদ, পুরাণ এবং স্মৃতিশাস্ত্রের সাংঘাতিক শাসন, তাদের বুদ্ধি আড়ষ্ট ও পক্ষঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়বারই কথা। তাদের মধ্যে বয়েল-এর মতো কোনো বৈজ্ঞানিকের জন্মগ্রহণ সম্ভবপর নয়..."

- 'এ হিস্ট্রি অব হিন্দু কেমিস্ট্রি', আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়

...........................................................................................


'গাজওয়াতুল হিন্দ' এর চাড্ডি ভার্সন

...........................................................................................

সংস্কৃত ভাষার বিখ্যাত ব্যাকরণবিদ পাণিনি জাতিতে ছিলেন আফগানী। তারপরও বিশেষ করে ভারতের উগ্র হিন্দুরা কেবল বর্তমান ভারতের অংশের ইতিহাস নিয়ে ভাঙা রেকর্ড বাজাতে থাকবে অবিভক্ত উপমহাদেশের সামগ্রিক ইতিহাস ভুলে এবং গায়ের জোরে দাবী করতে থাকবে সংস্কৃত ভাষার উৎপত্তি, আর্যদের আদি নিবাস ইত্যাদি সংক্রান্ত কাল্পনিক ইতিহাস।
.........................................................................................

সমাজতন্ত্র বিদ্বেষী চাড্ডিদের তান্ডব 

............................................................................................


ভাই পরমানন্দ ছিলেন সেক্যুলার গদর পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং লাহোরের আর্য সমাজের অন্যতম নেতা। পরবর্তীতে তিনি কট্টর হিন্দুত্ববাদীতে পরিণত হন এবং হিন্দু মহাসভার প্রথমসারির নেতা হয়ে যান। ১৯০৫ সালে বাংলা বিভাজনের সময় তিনি প্রস্তাব দিয়েছিলেন সিন্ধুকে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ এবং আফগানিস্তানের সাথে যুক্ত করার মধ্য দিয়ে বৃহত্তর মুসলিম রাজত্বের মধ্যে একীভূত হওয়ার জন্য।

https://en.m.wikipedia.org/wiki/Bhai_Parmanand

https://en.m.wikipedia.org/wiki/Ghadar_Movement
...............................................................................................

নিচে কাবুলের 'আরিয়ানা স্কয়ার' এবং 'আরিয়ানা আফগান এয়ারলাইন্স' এর বিমানের ফটো দেয়া হলো। পাকিস্তান অংশের পাঞ্জাব, সিন্ধু, খাইবার পাখতুনখোয়া, বেলুচিস্তান, আফগানিস্তান ছিল 'আর্যাবর্তে'র অংশ যেখানকার অধিবাসী বর্তমান ধর্মান্তরিত মুসলমানদের পূর্বপুরুষ ছিল আর্যরা। অথচ উনিশ শতকের উগ্র হিন্দুত্ববাদী লেখকরা ছাড়াও প্রগতিশীল বলে খ্যাত অবিভক্ত ভারতের অনেক লেখক 'আর্য' আর 'হিন্দু' শব্দ দু'টোকে সমার্থক হিসেবে দেখাতেন। যেমন- বঙ্কিমচন্দ্র নিরীশ্বরবাদী বৌদ্ধদের নাম পর্যন্ত সহ্য করতে পারতেন না। অথচ অজন্তা, ইলোরার মতো বৌদ্ধদের পুরাকীর্তিকে আর্য হিন্দুদের কীর্তি বলে চালিয়ে দিয়েছিলেন!



............................................................................................


তথাকথিত সেক্যুলার পাবলিকদের দেশ ভারতে উপরের এই উগ্র হিন্দুত্ববাদী ভাবধারার বইয়ের প্রথম এক বছরের মধ্যেই চারটা সংস্করণ বাজারে ফুরিয়ে গিয়েছিল!
..............................................................................................

শঙ্করাচার্যের সময়ে এক কোটি বৌদ্ধকে হত্যা করা হয়েছিল অবিভক্ত ভারতে। তিনি বিধান দিয়ে বলেছিলেন- 

"তুমি একজন বৌদ্ধকেও যদি হত্যা না করো, তোমার সাত পুরুষের নরকবাস হবে!"

Comments

Popular posts from this blog

চাড্ডিগণ [এক]

মুস্তারেবিন

পাকিস্তান ও ইজরায়েল