সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ে ক্যাস্ত্রোর স্বীকারোক্তি [পর্ব-এক]

 

কেনেডি, আপনি এবং সেইসাথে গোটা দুনিয়ার মানুষ ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর আন্তর্জাতিক সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে, যাকে তথাকথিত '১৯৬২ সালের অক্টোবরে কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র' সংকট বলা হয়, যা কিউবায় শুধু 'অক্টোবর সংকট' নামেই পরিচিত ৷ আজ ৪৩ বছর পর এই ঘটনাকে কিভাবে দেখছেন?

এটা ছিল শ্বাসরুদ্ধকর সময় এবং এই সংকট থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। কিউবার বিরুদ্ধে আগ্রাসী এবং বর্বর মার্কিন নীতির ফলশ্রুতি হিসেবে পরমাণু যুদ্ধের একেবারে কিনারে দাড়িয়েছিল বিশ্ব। গিরনে অপমানজনক পরাজয়ের প্রায় দশ মাস পর এই পরিকল্পনা গ্রহন করে কেনেডি সরকার ৷ আর সংকট ছড়িয়ে পড়ার আট মাস আগে পরিকল্পনাটি মাঠে গড়ানো হয়। এর মূল উপজীব্য ছিল কিউবাকে বশে আনতে সরাসরি মার্কিন বিমান, নৌ এবং স্থলবাহিনী ব্যবহার করে একটা পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন চালানো। পরিকল্পনাটি সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য সংগ্রহে সমর্থ হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং আসন্ন বিপদ সম্পর্কে কিউবাকে সময়মতো সতর্কও করে, যদিও তাদের তথ্য বিশদ ছিল না। সত্যি বলতে কি, তারা তাদের সূত্রের নিরাপত্তা রক্ষা করতেই বিস্তারিত কিছু বলেনি। বলা হলো ভিয়েনায় কেনেডি এবং ক্রুশ্চেভের মধ্যকার বৈঠকের পর এই বিশ্বাস জন্মেছে তাদের মনে। এ ব্যাপারে আমরা এবং বিশ্ববাসী সবিস্তার জানতে পারে সংকটের কুড়ি বছর পর, যখন মার্কিন সরকার নিজে থেকেই নথিপত্র প্রকাশ করে। আমাদের সাথে কথা বলার জন্য উজবেকিস্তানে দলীয় সেক্রেন্টারির দায়িত্ব পালনকারী 'শরাফ রাশিদভ' এবং ইউএসএসআর (ইউনাইটেড সোভিয়েত সোশ্যালিস্ট রিপাবলিক) এর স্ট্র্যাটেজিক রকেট ফোর্সেসে'র কমান্ডার মার্শাল সার্গেই বিরুয়ুঝভকে পাঠায় সোভিয়েত। প্রথম দফার আলাপে আমি ও রাউল উপস্থিত ছিলাম। উপরোল্লিখিত তথ্য জানানোর পর তারা আমার কাছে জানতে চায় এই ঝুঁকি নিরসনে বা প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা নেয়া উচিত বলে আমি মনে করি। আমি খুব শান্তভাবে তাদের বলি: 

"একটা প্রকাশ্য বিবৃতির মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে দিন (নিজেদের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র তাই করে থাকে) যে কিউবায় যেকোনো প্রকার আগ্রাসনকে সোভিয়েত ইউনিয়নের উপর আগ্রাসন হিসেবে গন্য করা হবে।"

এরপর এই বুদ্ধির পক্ষে নিজের যুক্তি তুলে ধরি। আমার পরামর্শের ব্যাপারে তারা বেশ কিছু সময় চিন্তা ভাবনা করে এবং এক পর্যায়ে আমাকে বলে,

"বিবৃতিই যদি দিতে হয়, তাহলে তা কোনো সাধারণ বিবৃতি হলে চলে না, এর জন্য কিছু বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে।" 

এরপর তারা জানায় যে, এই বিবৃতি দেয়ার প্রাক্কালে কিউবায় কিছু মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করতে হবে। আমার দৃষ্টিতে তাদের এই অবস্থানের পেছনে পরিষ্কার উদ্দেশ্য ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সোভিয়েত সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকের শক্তির ভারসাম্য আনা। আমাকে অবশ্যই এ কথা স্বীকার করতে হবে যে, এই পরিকল্পনা প্রাথমিকভাবে আমার মন:পৃূত ছিল না। কারণ 'কিউবা' সোভিয়েত ইউনিয়ন বা অন্য কোনো বিশ্ব শক্তির 'ঘাঁটি', এমন ভাবমূর্তি তৈরি হোক তা কখনোই আমার প্রত্যাশিত ছিল না। অতএব আমি প্রত্যুত্তরে বললাম: 

“চলুন বিরতি নেয়া যাক, অতীব গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয় নিয়ে আমাদের বিপ্লবী ন্যাশনাল ডাইরেক্টরেটের মতামত জানতে চাই।"

ন্যাশনাল ডাইরেক্টরের বৈঠক ডাকলাম দুপুরে। রাউল ছাড়াও উপস্থিত কম্পানেরোদের মধ্যে ছিলো ব্লাস রোকা, চে, ডর্টিকোস এবং কার্লোস রাফায়েল। আমি তাদের বিস্তারিত অবহিত করি যে, 'কিউবায় আসন্ন বিপদের ব্যাপারে সোভিয়েতের উদ্বেগ কোথায় এবং তা ঠেকাতে আমাদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতিশীল অবস্থানের চিত্রটি কেমন'। ক্রুশ্চেভের ব্যক্তিগত প্রতিশ্রুতিশীল মনোভাবেরও উল্লেখ করা হয়। এ-ও ব্যক্ত করা হয় যে, কিউবায় ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের মাধ্যমে বিশ্বে শক্তির ভারসাম্য কোথায় গিয়ে পৌঁছাতে পারে। এই পর্যায়ে দৃষ্টান্ত টেনে 'সোভিয়েতের দুই প্রতিবেশী তুরস্ক এবং ইটালিতে অতি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের একই ধরনের অস্ত্র মোতায়েনের ঘটনার সমুচিত জবাব হবে' বলে মন্তব্যও করা হয়। আলোচনার এক পর্যায়ে আমি মন্তব্য করলাম 'এই পরিকল্পনা ধরে অগ্রসর হলে যদি সত্যি সত্যি মার্কিন আগ্রাসনের শিকার হয় কিউবা, তাহলে সোভিয়েত কিংবা অবশিষ্ট সমাজতান্ত্রিক শিবির থেকে যথাযথ সাহায্য আসবে এমনটি মনে করার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই, তাই এর রাজনৈতিক ফলশ্রুতি এবং কিউবার ভাবমূর্তির জন্য এই পরিকল্পনা গ্রহণ আসলে বড় ঝুঁকি নেয়ার সামিল'। উপস্থিত কম্পানেরোরা সর্বসম্মতিক্রমে আমার নৈতিক ও বৈপ্লবিক অবস্থানকে সমর্থন জানালো। এরপর সোভিয়েত প্রতিনিধি দলটির সাথে আমাদের বৈঠক আবার শুরু হলো। আমি তাদের বললাম, 'যদি কিউবাকে সম্ভাব্য মার্কিন আগ্রাসন থেকে রক্ষা, একইসাথে সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা সমাজতান্ত্রিক শিবিরের শক্তি বৃদ্ধি এই পরিকল্পনার অভিষ্ট হয়ে থাকে, তার জন্য যতগুলো ক্ষেপণাস্ত্র দরকার মোতায়েনে আমাদের কোনো আপত্তি নেই'। পরের বেশিরভাগ সময় ব্যয় হলো এর সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়াদি এবং খুঁটিনাটি আলোচনায়। আপাতত ৪২টি মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পাঠানো হবে। এছাড়া কিউবায় নৌ, বিমান এবং স্থলবাহিনীকে ক্ষেপণান্ত্র সক্ষম প্যাট্রল বোট, মিগ-২১ ফাইটার বিমানের একটি রেজিমেন্ট, সশস্ত্র পার্সোনেল পরিবহন ও ট্যাঙ্ক সমভিব্যাহারে মোটরচালিত ইনফ্যান্ট্রির চারটি বিগেড, কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র যথা পরমাণু বোমা, টর্পেডো ইত্যাদি সরবরাহ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। শেষোক্ত অস্ত্রগুলো ব্যবহারের জন্য যথোপোযুক্ত দক্ষতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের নিযুক্ত করা হবে এবং সংকটের মুহুর্তে উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশের অপেক্ষায় না থেকে তারা তাদের কর্তব্য পালন করবে। কয়েক বছর পর এসব তথ্য জেনে ভূতে পাওয়া দশা হবে রবার্ট ম্যাকনামারার (কেনেডির প্রতিরক্ষামন্ত্রী)। কৌশলগত পরমাণু অস্ত্রের সুরক্ষার জন্য ত্রিশ কিলোমিটার পাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাটারি বসানো হবে কিউবায়। সংকটের পাঁচ মাস আগে এই আলোচনাটি অনুষ্ঠিত হয়। এবং নষ্ট করার মতো একটি সেকেন্ডও আর অবশিষ্ট নেই হাতে। সার্বিক চেষ্টা ছিল এককথায় অতুলনীয়। এই পটভূমিটুকু মাথায় না থাকলে আপনার পক্ষে বোঝা সম্ভব হবে না ৬২'র অক্টোবরে আসলে কী ঘটেছিল। আলোচনায় অন্যান্য প্রসঙ্গের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরির বিষয়টিও স্থান পায়। সোভিয়েতের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এগুলো পাঠিয়ে দেবে এবং তা করেও ছিল। আমি গভীর মনোযোগের সাথে খুঁটিনাটি পড়লাম। ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন সংক্রান্ত চুক্তি বা সামরিক সমাঝোতা পত্রটিতে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু অস্বচ্ছতা আছে বলে আমার মনে হয়। ফলে এতবড় গুরুত্ববহ বিষয়ে এই চুক্তির বক্তব্যকে একটি সরকারী নথি হিসেবে প্রকাশ করা আমার কাছে সংগত মনে হলো না। আমি খসড়াটি সংশোধনীসহ আমার মতো করে লিখি, বড় অক্ষরে এবং রাউলের মাধ্যমে তা মস্কোয় পাঠালাম। সোভিয়েত প্রতিরক্ষামন্ত্রী মালিনোভস্কি এবং ক্রুশ্চেভ উভয়ের সাথেই সাক্ষাত করে সে। একটা 'ফুলস্টপ' বা 'কমা' বাদ না দিয়েই খসড়াটি গ্রহণ করে তারা। এরপর শুরু হয় প্রস্তুতি। স্বল্পতম সময়ের মধ্যে উপরোল্লিখিত সামরিক অস্ত্র এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মোতায়েনে কিউবান এবং সোভিয়েত সশস্ত্রবাহিনীর দক্ষতার প্রশংসা করতেই হবে। প্রথম পর্যায়ে সোভিয়েত বিশেষজ্ঞদের সাথে আমরা ঘুরে ফিরে দেখতে থাকি কোথায় স্পর্শকাতর ক্ষেপণাস্ত্র, পরমাণু ওয়ারহেডগুলো স্থাপন করা সর্বাপেক্ষা ঝুঁকিমুক্ত হবে। এবং এগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করার পক্ষেও সর্বোত্তম জায়গা কোনটি হতে পারে। ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের পরিকল্পনা এগিয়ে নেয়ার পাশাপাশি সশস্ত্রবাহিনীতে বিভক্তি, শৃংখলাভঙ্গের আশংকা, ছদ্মবেশি অনুপ্রবেশের মতো ইস্যুগুলোকেও নজরে রাখতে হয়েছে, যেটি সবচেয়ে কঠিন কাজ। এক্ষেত্রে আমাদের গণ সংগঠন এবং বৈপ্লবিক রাজনৈতিক দল এবং সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা ও ইউনিটগুলো যে ঐক্যবদ্ধ এবং বিশ্বস্ততাপূর্ণ সহযোগীতার প্রমাণ দিয়েছে তা বোধয় বিশ্বে নজীরবিহীন। কিন্তু এর মধ্যেও গুজব বা রটনা বন্ধ ছিল না। বিপ্লবের প্রতি অসংবেদনশীল গোষ্ঠী নিয়মিতই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকারী তাদের আত্মীয় ও বন্ধুদের কাছে বিভিন্ন তথ্য পাঠাতো যা তাদের পক্ষে যোগার করা সম্ভব। কেনেডি এ নিয়ে বিরোধী দল এবং সংবাদপত্রের প্রশ্নের মুখে পড়লেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এক আশ্চর্য এবং বাইজান্টাইন আলোচনা (যে আলোচনার কোনো শেষ নেই বলে মনে হয়) শুরু হলো মূলত কিউবায় সরবরাহ করা অস্ত্রগুলোর আক্রমনাত্মক বনাম প্রতিরক্ষামূলক চরিত্র নিয়ে। ক্রুশ্চেভ কেনেডিকে আশ্বস্ত করলেন যে, এগুলো প্রতিরক্ষামূলক। কিউবার ক্ষেত্রে ক্রুশ্চেভের কথা মানতে হলে কেনেডিকে বিশ্বাস করতে হবে সেখানে কোনো মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নেই। আমার ধারণা নিজের মতো করে বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন তিনি; ক্রুশ্চেভের সুনির্দিষ্ট আশ্বাস, বিশেষ করে অস্ত্রগুলোর প্রতিরক্ষা চরিত্র প্রমানের জন্য তার যুক্তিসমূহ আমলে নিয়ে। সোভিয়েতের এসব ব্যাখ্যায় যাবার কোনো দরকার ছিল না। কিউবা এবং ইউএসএসআর যা করেছে তা সম্পূর্ণ বৈধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের চোখেও অসংগতিবিহীন। শুরু থেকে একটি বিষয়ের ঘোষণাই যথেষ্ঠ ছিল যে, কিউবায় মোতায়েন করা অস্ত্রসমূহ এর প্রতিরক্ষার জন্য অপরিহার্য। গণবিতর্ক যেদিকে মোড় নিচ্ছিল তা আমাদের পছন্দ হয়নি। আমি উদীয়মান পরিস্থিতি নিয়ে আমার চিন্তা-ভাবনার কথা এবং কিউবা ও সোভিয়েতের মধ্যে স্বাক্ষরিত সামরিক চুক্তিটি এক্ষণে প্রকাশের গুরুত্ব ক্রুশ্চেভের কাছে তুলে ধরতে চে গুয়েভারাকে পাঠালাম। সে তখন শিল্পমন্ত্রী এবং 'ওআরআই' এর ন্যাশনাল ডাইরেক্টরেটের সদস্য। তবে দুর্ভাগ্য যে, আমি তাকে বোঝাতে ব্যর্থ হই। পরে তিনি তার উত্তরে জানিয়েছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র অতি প্রতিক্রিয়াশীল আচরণ করলে প্রয়োজনে বাল্টিক সাগরে অবস্থানকারী সোভিয়েত নৌবহর পাঠিয়ে দেবেন। আমাদের কাছে, কিউবান জনগনের কাছে সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন শক্তিধর এবং অভিজ্ঞ সরকার। কিন্তু পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে তা সামলাতে তাদের কৌশলগত প্রস্তুতি এবং চিন্তাভাবনায় যে খাদ আছে সে কথা ব্যাখ্যা করার মতো আর কোনো যুক্তি আমাদের কাছে অবশিষ্ট নেই। অতএব, তাদের উপর আস্থা রাখা ছাড়া আমাদের হাতে আর কোনো বিকল্পও রইলো না।

সংকট শুরু হলো কিভাবে?

আমেরিকা ১৪ ও ১৫ অক্টোবরে ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের বিষয়টি সনাক্ত করে। আকাশের অনেক উপর দিয়ে একখানা ইউ-টু গুপ্তচর বিমান পাঠায় তারা, যেটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপন মঞ্চের ছবি তুলে ফেরত যায়। আসল সত্য, আজ এতোদিন পর আমরা জেনেছি যে, সোভিয়েত গোয়েন্দা বিভাগের কর্নেল ওলেগ পেনকোভস্কির পাঠানো তথ্যের উপর ভিত্তি করেই গুপ্তচর ইউ-টু বিমান পাঠিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কেনেডিকে ১৬ অক্টোবর জানানো হয় এ কথা। সংকট তৈরি হয় আরো ছয় দিন পর। ক্রুশ্চেভের মনোভাব দেখে যেটি বোঝার বা বিশ্বাসের কোনো উপায় ছিল না তা হলো, সমগ্র কিউবা জুড়ে ছড়িয়ে রাখা ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির অবস্থান সনাক্ত করতে শত্রুর তৎপরতা তথা ইউ-টু জাতীয় গুপ্তচর বিমান এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত পন্থার ব্যাপারে তিনি এতোটা গা ছাড়া বা উদাসীন কেন? ফলে এটি এখন আর কৌশলগত বা ছলাকলার বিষয়ের মধ্যে আটকে নেই। এটি এখন পরিষ্কার যে বিষয়টি উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সোভিয়েতের দৃঢ় অবস্থান প্রকাশে সদিচ্ছার 'উপস্থিতি' কিংবা 'অনুপস্থিতির'। আমার বিচারে যা তখনও বলেছি এখনও বলি, শত্রুর গুপ্তচর বিমান উড়তে দেয়ার অর্থই হলো তাদের হাতে অমূল্য সুবিধা তুলে দেয়া, যা তাদেরকে রাজনৈতিক এবং সামরিকভাবে সংগতিপূর্ণ একটি পরিকল্পনা তৈরির পক্ষে এক সপ্তাহ সময় দিয়েছিল। আর সংকট যখন শুরু হলো, ক্রুশ্চেভ জানেনই না তার কী করণীয়! প্রথম বিবৃতিতে কেনেডির পদক্ষেপের ধিক্কার জানানোয় তার শক্তি ক্ষয়ের বিষয়টি স্পষ্ট।

এই পর্যায়ে কেনেডি কী করলেন?

১৯ অক্টোবর কেনেডি তার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফদের সাথে বৈঠকে বসেন। কিউবায় ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোর উপর বিধ্বংসী বিমান হামলা চালানোর একটি পরিকল্পনায় তারা কেনেডিকে অনুমোদন দেয়ার উপদেশ দিলো। পরের দিনের উপদেশে (এদিন কেনেডির প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট ম্যাকনামারার) প্রলুব্ধ হয়ে কিউবার উপর নৌ অবরোধ আরোপের সিদ্ধান্ত নেন কেনেডি। এ লক্ষ্যে ১৮৩টি যুদ্ধজাহাজ পাঠানো হবে, যার মধ্যে ৮টি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার এবং ৪০,০০০ সেনা পরিবাহী জাহাজ থাকবে। ফ্লোরিডায় ৫৭৯টি যুদ্ধবিমান এবং পাঁচখানা সশস্ত্রবাহিনী বিভাগকে প্রস্তুত ও সতর্ক অবস্থায় রাখা হলো। এর মধ্যে বিমানবাহিনীর দু'টি এলিট বিভাগ, যথা ৮২ তম এবং ১০১তম এয়ারবোর্ন। কিন্তু তখনও মার্কিন নাগরিক এবং বিশ্ববাসী জানে না কী ঘটতে চলেছে।

কেনেডি কখন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিলেন?

টেলিভিশনে তিনি বক্তব্য দেন ২২ অক্টোবর, সন্ধ্যা ৭টায়। প্রত্যেক চ্যানেল ও নেটওয়ার্কে তার বক্তব্য ছড়িয়ে যায় এবং প্রচারিত হয় অত্যন্ত নাটকীয়তার সাথে। আর তখনই গোটা বিশ্বের সামনে 'সংকট'টি উন্মোচিত হলো এবং সবাই মালুম করলো যে, একটি পারমাণবিক সংঘাত অত্যাসন্ন। সোভিয়েত ইউনিয়নকে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র সড়িয়ে নেয়ার দাবী জানালেন কেনেডি, অন্যথায় পারমাণবিক যুদ্ধের অনিবার্যতার কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। সেইসাথে নতুন কোনো ক্ষেপণাস্ত্রের চালান যাতে কিউবায় পৌঁছাতে না পারে সেই লক্ষ্যে কিউবার চারদিকে নৌ অবরোধ কার্যকরের কথাও ঘোষণা করেন তিনি। অবশ্য ইত্যবসরে কর্নেল ওলেগ পেনকোভস্কিকে পাকড়াও করেছে মস্কো এবং এই সুবাদে তারা বুঝে গেছে যে, আমেরিকার কোনো কিছু জানতে আর বাকি নেই। এই তথ্যও আর তাদের কাছে গোপন রইলো না যে কেনেডির কাছে লেখা চিঠিতে ক্রুশ্চেভ যে মিথ্যা বলেছেন সেটিও কেনেডি জেনে গেছেন। 

আমেরিকানরা কী কী জানে তা আপনাকে কখন জানানো হলো?

ঈশ্বরের নামে কিরে কেটে বলছি, ২২ অক্টোবর সন্ধ্যায় যখন হঠাৎ টিভি ও বেতারে বেশ আকর্ষণীয় ঢঙ্গে প্রচার করা হলো যে, সন্ধ্যায় ভাষণ দেবেন কেনেডি। এছাড়া কিছু লক্ষণও আমার গোচরীভূত হয়েছিল। ইতিমধ্যে কিউবায় অবস্থানরত সোভিয়েতবাহিনী আমার নির্দেশে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপন মঞ্চ তৈরির কাজ প্রায় শেষ করে এনেছে। আমি তাদের বলেছিলাম যতো দ্রুত সম্ভব কাজ এগিয়ে নিতে, কারণ আমাদের লড়াইয়ের জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহনের সময় বেশি নেই। ১৬ অক্টোবর একটি মঞ্চও প্রস্তুত ছিল না। আমার নির্দেশের পর ১৮ অক্টোবর ৮টি, ২০ তারিখ ১৩টি এবং ২১ তারিখে কুড়িটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপন মঞ্চ তৈরি হয়।

[ফুটনোট: কেনেডির সাথে ক্রুশ্চেভের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। ক্রুশ্চেভ কেনেডিকে একটি চিঠি লিখলেন, যেখানে তিনি মিথ্যার আশ্রয় নিলেন। তিনি বললেন এগুলো প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র, আক্রমনাত্মক অস্ত্র নয়। তার কথা মিথ্যা নয়, বস্তুত প্রতিরক্ষামূলক, কিন্তু এর আক্রমনাত্মক সামর্থ্যও রয়েছে। ৩৬টি কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে এখানে। এবং এ-ও বলা হলো যে, এসবের দায়িত্বে থাকা সোভিয়েত জেনারেল প্রয়োজন এবং পরিস্থিতি মতো নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারবেন। ক্রুশ্চেভের চিঠি কেনেডির কাছে পৌঁছে দেন সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রে গ্রোমিকো। ১৮ অক্টোবর এই চিঠি নিয়ে যান তিনি।]

এমন ভয়াবহ এবং অভূতপূর্ব বিপদের সামনে দাঁড়িয়ে কিউবানদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?

যা বলছিলাম যে কিছু লক্ষণ গোচরীভূত হওয়ায় পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরেছিলাম, ফলে কেনেডির ভাষণ দেয়া উপলক্ষ্যে প্রচারমাধ্যমের তোড়জোড়ের দৃশ্যটিও মালুম হতে থাকে। তিনি সম্প্রচার মাধ্যমের সামনে আসার আগেই কিউবায় যুদ্ধের সংকেতসূচক এ্যালার্ম বাজানোর নির্দেশ দিই এবং সৈন্যসারির শেষ ব্যক্তিটিকেও সতর্ক অবস্থানে তৈরি থাকার নির্দেশ দেয়া হয়। অর্থাৎ ৩ লাখের কিছু বেশি সেনাকে যুদ্ধের (বিশেষত: আত্মরক্ষামূলক) জন্য অস্ত্র হাতে প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। কেনেডির বক্তব্যের জবাব দিতে ২৩ অক্টোবর পাল্টা টেলিভিশনের পর্দায় হাজির হলাম আমি। মার্কিন নীতির আগ্রাসী প্রকৃতি এবং সর্বাত্মক যুদ্ধের ঝুঁকি ও এর সুদূরপ্রসারী পরিণতি সম্পর্কে তাদের উদাসীনতার বিষয়টিকে সামনে আনলাম যতোটা পারা যায়। একটি জাতির সার্বভৌমত্বের প্রতি আমেরিকার নজীরবিহীন হুংকার বিশ্ব ব্যবস্থার জন্য কতোটা দূর্বিষহ পরিণাম বয়ে আনতে পারে সেই বিষয়ে মার্কিন নাগরিক এবং বিশ্ববাসীকেও সতর্ক করলাম।

মার্কিন নৌ-অবরোধ কী সত্যিই কার্যকর করা হয়েছিল?

হ্যাঁ, অবশ্যই। ২৪ অক্টোবর দুপুর দু'টায়। ঠিক সেই মুহুর্তে ২৪টি সোভিয়েত নৌযান কিউবা অভিমুখে রওনা করেছে। ফলে যেকোনো মুহুর্তে অভাবনীয় কিছু ঘটে যেতে পারে। মার্কিন জাহাজ থেকে সোভিয়েত জাহাজ লক্ষ্য করে কেউ একটা গুলি ছুড়ে দিলেই ব্যস, পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। সুতরাং, উত্তেজনা ছিল চরমে।

ঐ অবস্থায় জাতিসংঘ কী করেছে?

বিখ্যাত সেই বিতর্ক, যেটিকে বিরক্তিকর বলে চিহ্নিত করেছি আমি, জড়িয়েছিলেন জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত আলদাই স্টিভেনসন এবং সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত ভ্যালেরিনা জোরিন। স্টিভেনসন (২০০৩ সালের ৪ ফেব্রুয়ারী কলিন পাওয়েল যা করেছেন, ভিত্তিহীন তথ্য উপস্থাপন করে ইরাকের উপর অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়ার পক্ষে সাফাই গেয়ে) কিউবায় 'ইউ-টু' গুপ্তচর বিমানের মাধ্যমে আকাশ থেকে তোলা ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ মঞ্চের তাড়ি তাড়ি ছবিসমেত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটা আকর্ষণীয় প্রেজেন্টেশন উপস্থিত করেন। সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত এসব প্রমানাদি সত্ত্বেও অভিযোগ ডাহা অস্বীকার করেন। বললেন, এগুলোর কোনো বাস্তবতা নেই, তৈরি করা ছবি। তিনি বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই বলে দাবী করেন। আসলে এই লোক বিতর্কের জন্য তৈরিই ছিলেন না, কারণ তার বক্তব্যে না আক্রমণ আর না আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ্য ভর্ৎসনা করলেন। 'ছোটো একখান দেশ কিউবাকে তার প্রকান্ড শক্তির সুপারপাওয়ার দেশটি যে সকাল বিকেল হুমকি দিচ্ছে প্রকাশ্যে ও গোপনে, ফলে কিউবার সাহায্যের আবেদনে সাড়া দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন যে এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে' এ ধরনের জোড়ালো অবস্থানের আশেপাশেও গেলেন না তিনি। বলতে পারতেন আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার রাষ্ট্রীয় মূলনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে কিউবার পাশে দাঁড়িয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়ন। অথচ এসব বাদ দিয়ে মধ্যামধ্যি (ভালোও নয়, মন্দও নয় এমন) একটা অবস্থানে দাঁড়িয়ে অহেতুক তর্ক করতে থাকলেন সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত। বিষয়টি নিয়ে ক্রুশ্চেভ সরকারের ভেতর ফাঁক, অপ্রস্তুত অবস্থা দৃশ্যমান হতে থাকলো তার এই ফাঁকা বিতর্কে। সত্যিকার বিতর্কের উপলক্ষ্যটিকে এড়িয়ে গেলেন (যেটি হতে পারতো কিউবার সার্বভৌম অধিকার রক্ষার উপর) জ্ঞানত না অজ্ঞানত: তা বুঝলাম না। ১৯৬২ সালের ২৫ অক্টোবরের ঘটনা বলছিলাম। ইতিমধ্যে, আমার ধারণা, কিউবার উপর দিয়ে সামরিক পর্যবেক্ষক বিমানের উড়াল চালিয়ে গেছে আমেরিকানরা। হ্যাঁ, তারা তাই করেছে। এবং তা করেছে সম্পূর্ণ দায়মুক্ত, স্বাধীনভাবে। অথচ নিচে, মাটিতে, বিমান বিধ্বংসী ব্যাটারি বসানো হয়েছে কিন্তু এসব প্রতিরোধের জন্যই। রাষ্ট্র বিরোধী নগ্ন, নির্লজ্জ গুপ্তচরগিরিকে এক থাবায় বুঝিয়ে দেয়ার জন্য যে, আমরাও তোমাকে দেখে ফেলেছি। তারা ইউ-টু এবং সমগোত্রীয় গুপ্তচর বিমান পাঠাতেই লাগলো এবং ক্রমান্বয়ে এগুলো যতোটা পারলো নিম্ন উচ্চতায় উড়তে লাগলো। এই নিম্ন উচ্চতায় উড়ন্ত বিমানগুলোকে গুলি করে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা। হেলিকপ্টারের সমান উচ্চতা দিয়ে ওড়ার সময় বিমানগুলোকে আপনি খালি চোখে সনাক্ত করতে পারবেন না, সুতরাং ওগুলোকে গুলি করে চমকে দেয়া সহজ। সোভিয়েত সামরিক কর্মকর্তাদের আমরা বোঝালাম, এতো নিচ দিয়ে বিমান ওড়ার সুযোগ দেয়া উচিত নয়। এর আগেও আমরা তাদের জানিয়েছি যে, এগুলোকে ধরাশায়ী করতে যাচ্ছি আমরা। বিমান বিধ্বংসী আর্টিলারি দিয়ে আমরা তাই করলাম। ২৭ অক্টোবর, ওরিয়েন্তে প্রদেশে এসএএম ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারির গুলিতে একখানা মার্কিন 'ইউ-টু' বিমানকে নামিয়েও আনলো সোভিয়েত সেনারা। সংকটের চূড়ান্ত উত্তেজনার সময় সেটা। আমেরিকান সেনা কর্মকর্তা, ইউ-টু বিমানের চালক রুডলফ এ্যান্ডারসন নিহত হন। যুদ্ধ যে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়ে গেছে, এই ঘটনা তার বিলক্ষণ প্রমাণ। যেকোনো মুহুর্তে আরেকটি ঘটনা ঘটে যাওয়ার অপেক্ষায় সবাই যেন রুদ্ধশ্বাস, প্রমাদ গুনছে যুদ্ধের। কিন্তু আমাকে আবারো বলতে হচ্ছে, 'কিউবানদের মধ্যে উত্তেজনা নেই, তারা শান্ত ও নির্বিকার'।

এর কোনো পর্যায়ে আপনার কি মনে হয়েছে যুদ্ধ অনিবার্য? 

উত্তেজনার পারদ চড়ছেই। এবং আমরা নিজেদের মধ্যে ভাবনা ও আলোচনা করলাম যে, সর্বাত্মক যুদ্ধ অনিবার্য। বলাবাহুল্য যে, সেই ঝুঁকি নেয়ার জন্য আমাদের প্রস্তুতির অভাব ছিল না। প্রতিপক্ষের হুমকিতে ভীত হয়ে নিবৃত্ত হওয়ার কোনো নজীর অন্তত আমাদের নেই।

কিন্তু সোভিয়েতরা হলো?

নাটকীয় উত্তেজনার মধ্যে সোভিয়েতরা মার্কিনীদের কাছে একখানা প্রস্তাব রাখলো। এবং এ নিয়েও আমাদের সাথে কোনো আলাপের দরকার মনে করেননি ক্রুশ্চেভ। তাতে বলা হলো সোভিয়েত এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা প্রত্যাহার করবে যদি তুরস্ক থেকে একইভাবে জুপিটার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা তুলে নেয় মার্কিনীরা। ২৮ অক্টোবর এই প্রস্তাবে সম্মতি জ্ঞাপন করেন কেনেডি। এবং সোভিয়েতরা এসএস-৪ প্রত্যাহার শুরু করে, যা আমাদের কাছে চূড়ান্ত নির্বুদ্ধির পরিচায়ক বলে দৃষ্ট হলো। ঘৃনামিশ্রিত ক্রোধ জেগে উঠলো মনে।

আপনার কি মনে হয়েছে যে আপোষ রফা হয়েছে আপনার পেছনে?

পত্রিকাসূত্রে আমরা জানতে পারি যে, সোভিয়েত ক্ষেপণাস্ত্র প্রত্যাহারের ব্যাপারে একটা কিছু প্রস্তাব দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে, যার কানা ভগ্নাংশও আমাদের জানানো হয়নি, আর না জানার কোনো উপায় ছিল। আমরা সমাধানের বিপক্ষে ছিলাম ব্যাপারটা তা নয়, পারমাণবিক যুদ্ধের আশংকা যেখানে দোদুল্যমান। কিন্তু ক্রুশ্চেভের উচিত ছিল যুক্তরাষ্ট্রকে এটা বলা যে, আলোচনার মধ্যে কিউবাকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আসলে ওই মুহুর্তে তারা স্নায়ুযুদ্ধে হেরে গেছে এবং সংকল্পে দৃঢ়তা বজায় রাখতে পারেনি। মূলনীতি অনুসারে আমাদের সাথে আলোচনা করা উচিত ছিল তাদের। এবং যদি তারা আমাদের অর্ন্তভূক্ত করতো তাহলে অব্যবহিত চুক্তিটির প্রকৃতি ও শর্তাদি ভিন্নতর এবং আমাদের দিক থেকে আরোও সুবিধাজনক হতো নিঃসন্দেহে। তাহলে গুয়ান্তানামো নৌঘাঁটি বলে কিছু হতো না, কোনো গুপ্তচর বিমানের উড়ালও থাকতো না...এগুলো আমাদেরকে অপমানের সামিল, আমাদের প্রতি ধৃষ্টতা প্রদর্শন হিসেবে নিয়েছি। এবং এর প্রতিবাদও জানালাম। এছাড়া চুক্তির পরও নিম্ন উচ্চতায় উড়ন্ত বিমানকে গুলি করা বন্ধ করিনি। এরপর সোভিয়েতের সাথে আমাদের সম্পর্কে অবনতি ঘটতে থাকে, যার রেশ থাকে অনেক বছর পর্যন্ত। এই সংকটের সময়কালে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার পুরো বৃত্তান্ত আপনাকে বলার ইচ্ছে নেই বা সময়ও নেই। তবে উত্তেজনার সেই দিনগুলোতে ক্রুশ্চেভ এবং আমার মধ্যে যেসব পত্রাদি বিনিময় হয়েছে তার উল্লেখ না করলে কেউ সেই সময়ের রাজনৈতিক, সামরিক এবং নৈতিক মেজাজটা ধরতে পারবে না। 

ক্রুশ্চেভকে ২৬ অক্টোবর পাঠানো চিঠি পড়ে শুরু করতে চাই:

প্রিয় কম্পানেরো ক্রুশ্চেভ,

পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং আমাদের কাছে যেসব রিপোর্ট আছে তা বিশ্লেষণ করে আমার মনে হচ্ছে একটি আগ্রাসন অত্যাসন্ন - আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘন্টার মধ্যে হতে পারে। সম্ভাব্য আগ্রাসন দু'রকমের হতে পারে: প্রথম ক্ষেত্রে, নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা করে সেগুলোকে ধ্বংস করার মতো সীমিত লক্ষ্য অর্জন এবং দ্বিতীয় ক্ষেত্রে, পুরো মাত্রার আগ্রাসন যেটির সম্ভাবনা কম, আবার সবচে বেশি। আমার মত হলো, এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বিপুল সৈন্যসামন্ত ও যুদ্ধ প্রস্তুতি প্রয়োজন। অতএব তা তাদের কাছে অপছন্দনীয় হলেও হতে পারে, তাদেরকে একমাত্র নিবৃত্ত করতে পারে এটিই। তবে তারা যেই বিকল্পই বেছে নিক না কেন, আমাদের প্রতিরোধ আক্রমণ হবে মরণপণ এ ব্যাপারে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। কিউবানদের নৈতিকতা অত্যন্ত উঁচু মানের। এবং আমরা বীরের মতো হানাদারদের মোকাবিলায় বদ্ধপরিকর। এই পরিস্থিতিতে আপনাকে একান্ত গোপনীয় একটি মতামত জানানোর ইচ্ছা পোষণ করি। যদি দ্বিতীয় পথটি বেছে নেয় আমেরিকা, অর্থাৎ একটা চুড়ান্ত আগ্রাসনের মাধ্যমে কিউবাকে দখল করে নেয়, সেটি হবে মানবতার বিরুদ্ধে চুড়ান্ত ধ্বংসাত্মক একটা নীতি এবং যদি তা ঘটেই যায় তাহলে পরবর্তী পরিস্থিতিতে সোভিয়েতের বিপক্ষে প্রথম পারমাণবিক আক্রমণের সুযোগটি যেন তাকে না দেয়া হয়। আমি একথা বলতে বাধ্য হচ্ছি এ কারণে যে, এই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ধৃষ্টতা এমন বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কিউবা দখলের মতো নগ্ন এবং নির্লজ্জ আগ্রাসন তাদের কাছে এখন আর চমক বলে মানতে আমি রাজি নই। এটি আন্তর্জাতিক আইন ও নৈতিকতার প্রতি চরম ঔদ্ধত্য প্রদর্শনের সামিল হবে, তাই এমন পরিস্থিতি যদি এসেই যায় তাহলে বিশ্ব শান্তির জন্য এই আপদকে চিরতরে মুছে দেয়ার সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক হবে না এবং সেটি হবে আত্মরক্ষার সবচেয়ে বৈধ পদক্ষেপ। এই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আগ্রাসী নীতি, বিশ্ব মতামতকে পদদলিত করা, বিশ্ব সম্প্রদায়ের মূলনীতি ও আইনের প্রতি অবমাননা প্রদর্শন করার স্পর্ধা আমাকে এমন মতামত ব্যক্ত করতে প্রভাবিত করেছে। আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি তাদের নির্লজ্জ অবাধ্যতার প্রমান নৌ-অবরোধ, বলপূর্বক আমাদের সাগরপথ বন্ধ করে রাখা, আমাদের আকাশপথে বেআইনি উড্ডয়ন এবং এক্ষণ সর্বাত্মক আক্রমণের আয়োজন। এমনকি পরিস্থিতির উত্তাপ আঁচ করা সত্ত্বেও আলোচনার সকল সম্ভাবনা নস্যাৎ করতেও তারা কুণ্ঠিত নয়। আপনি শান্তি রক্ষার একজন নিরলস এবং অগ্রগামী দূত ছিলেন এবং আছেন। আমি বুঝতে পারছি এই তিক্ত সময় আপনার মনে কেমন ছায়া ফেলেছে, যেখানে আপনার অতিমানবীয় চেষ্টাসকল ন্যাক্কারজনকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে। শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত আমাদের আশা থাকবে যাতে শান্তি রক্ষিত হয়। বলাবাহুল্য এর জন্য আমাদের পক্ষে সম্ভব কোনো ত্যাগ স্বীকারে এতটুকু কার্পণ্য প্রদর্শিত হবে না। আরো একবার আপনার মারফত সোভিয়েত জনগনের প্রতি কিউবান জনগনের গভীর কৃতজ্ঞতা ব্যক্ত করছি, যারা এমন সংকটকালে এত দয়ালু হৃদয় এবং ভ্রাতৃসুলভ সম্ভাব নিয়ে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এবং আমাদের কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধাপূর্ণ অনুরাগ আপনার প্রতি, যার উপর এতোবড় পর্বতপ্রমাণ দায়িত্বের বোঝা অর্পিত হয়েছে।

ভ্রাতৃপ্রতিম

ফিদেল ক্যাস্ত্রো


২৮ অক্টোবর এর উত্তরে ক্রুশ্চেভ লিখলেন:

প্রিয় কমরেড ফিদেল ক্যাস্ত্রো,

২৭ অক্টোবর কেনেডির প্রতি আমাদের বার্তায় কিউবার বিরুদ্ধে আগ্রাসন প্রতিরোধে এবং উদ্ভূত সংকটের মধ্যে কিউবার অনুকূলে একটি সমাধান খোঁজার পরামর্শ ব্যক্ত করা হয়েছে। কেনেডির প্রত্যুত্তর বরাবর যেমন হয়ে থাকে, আপনি নিজেও অবগত আছেন, তিনি আশ্বস্ত করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এমন নিশ্চয়তা দিচ্ছে যে, কিউবায় কেবল তারাই আক্রমণ করবে না এমন নয়; তাদের কোনো মিত্রকেও আক্রমণ করতে দেয়া হবেনা। ১৯৬২ সালের ২৬ ও ২৭ অক্টোবর আমার বার্তাসমূহের প্রত্যুত্তরে এসবই বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। পেন্টাগন বর্তমানে আইনের শাসনের অধীন নয়, বরং সামরিক কৌশলবিদদের কিছু বিষয়ে অচেতনতার অধীন। চোখের সামনে যেহেতু একটি চুক্তি রয়েছে, তাকে নস্যাৎ করার ছুতা খুঁজছে তারা। আর এই লক্ষ্যেই উস্কানীমূলক বিমান উড্ডয়ন করছে। গতকাল একটিকে ভূপাতিত করেছেন আপনারা, যা কয়েকদিন আগেও করেননি। আপনার এই পদক্ষেপকে আগ্রাসী সামরিক কৌশলবিদরা তাদের পক্ষে নিয়ে যাবে। আপনি এবং আপনার সামষ্টিক লক্ষ্যের প্রতি শুভকামনা রইলো।

এন, ক্রুশ্চেভ


একই দিন, ২৮ অক্টোবর আমার উত্তর:

প্রিয় কম্পানেরো ক্রুশ্চেভ

আপনার আশ্বস্তিজ্ঞাপক বার্তার প্রতি আমাদের সরকারের অবস্থানের প্রতিফলন রয়েছে আমাদের অদ্য প্রস্তুতকৃত বিবৃতিটিতে, যার ভাষা নিশ্চিতভাবেই আপনি অবগত আছেন। বিমান বিধ্বংসী যে ব্যবস্থা আমরা নিয়েছি এ ব্যাপারে একটি বিষয় পরিষ্কার করে নিতে চাই। আপনি বলেছেন: "গতকল্য আপনারা একটি গুপ্তচর বিমান ভূপাতিত করেছেন, অথচ এর আগে কিউবার আকাশে এমন বিমান ভূপাতিত করেননি"। আগে আকাশপথ লংঘনের ঘটনাগুলো ছিলো প্রধানত বিচ্ছিন্ন এবং সুনির্দিষ্ট সামরিক উদ্দেশ্যবিহীন, যার কোনো নিশ্চিত হুমকি ছিল না। আজকের পরিস্থিতি ভিন্ন। নির্দিষ্ট কিছু স্পর্শকাতর সামরিক স্থাপনায় চমকদায়ী আক্রমণের সুযোগ রয়েছে। ফলে পেছনের সিটে বসে একটি চমকের অপেক্ষায় থাকার সিদ্ধান্ত থেকে আমরা সরে এসেছি। আমাদের পর্যবেক্ষণ রাডারের চোখ ফাঁকি দিয়ে শত্রু বিমান যেকোনো মুহুর্তে সামরিক স্থাপনাগুলোর উপর আঘাত হানতে পারে। সেগুলো ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। কিন্তু আমরা তা হতে দিতে পারি না, কারণ এর পেছনে বহু শ্রম এবং মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে আমাদের। তাছাড়া এমন ঘটনায় আমাদের নৈতিক মনোবল ও সাহস ধুলোয় লুটিয়ে পড়বে। এমন চিন্তা-ভাবনার চালিকাশক্তির উৎস কোথায় যদি জানতে চান তাহলে ফিরে যেতে হবে ২৪ অক্টোবরে, যেদিন ৫০টি বিমান বিধ্বংসী ব্যাটারি স্থাপন করে কিউবান সেনারা। সোভিয়েত অস্ত্রসম্ভার ও সৈন্যদের অবস্থানকে নিরাপদ করতে আমাদের সর্বশক্তি বিনিয়োগের দৃষ্টান্ত এটি। শত্রুর চমকদায়ী আক্রমণ এড়ানোর জন্য আর্টিলারির কাছে সময়মতো গুলি ছোড়ার নির্দেশ দেয়া ছিল। সোভিয়েত সেনা কমান্ড ভূপাতিত বিমান ও এর আরোহিদের দূর্ভাগ্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য আপনাকে জানাতে পারবে। আগে আমাদের আকাশসীমা লংঘন করা হতো চোরের বেশে এবং আকস্মিকভাবে। গতকাল আমেরিকানরা দিনে ও রাতের ইচ্ছামাফিক সময়ে বিমান উড়ানোর চেষ্টা করেছে স্পষ্ট করে এটা বুঝিয়ে দিতে যে, এর সুবিধা নিতে চাইছে তারা, যা বেআইনি। আমরা কি করে এটি বরদাস্ত করি? এটা আমাদের সার্বভৌম অধিকারের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন নয়? আলোচনার স্বার্থে আমরা এই ঘটনার পূনরাবৃত্তি আপাতত বন্ধ রাখবো। আমাদের সশস্ত্রবাহিনীর ব্যাটারি ইউনিটের কাছে অস্ত্র সংবরণের নির্দেশ পৌছানো হয়েছে, তবে স্মরণ করিয়ে দিই যে এই সংযমের মেয়াদ কেবল আলোচনার সময়টুকু; নিজের আকাশ সীমা লংঘনের অধিকার রক্ষায় আমরা চিরতরে হাত গুটিয়ে বসে থাকবো না। আরেকটি বিষয়েও আমাদের মধ্যে মতৈক্য থাকা প্রয়োজন যে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে একটি দূর্ঘটনাবশত গুলির ঘটনাও অসম্ভব নয়। আরো একটি বিষয় এই উছিলায় আপনাকে জানাতে চাই যে, নীতিগত কারণে আমরা নিজ ভূখন্ড পরিদর্শনের অনুমতি বা সুযোগ কাউকে দিতে পারি না। শান্তি বজায় রাখতে আপনার মহান ব্রতের প্রতি আমাদের অকুন্ঠ সমর্থন ও কৃতজ্ঞতা অক্ষুন্ন থাকবে এবং এই ব্রত রক্ষায় আমাদের লড়াইয়েও ভাটা পড়বে না। আর যদি সেই অভীষ্ট অর্জিত হয়, টেকসই এবং নিশ্চায়ক পন্থায় তা হবে মানবতার জন্য অভূতপূর্ব সেবা।

ভ্রাতৃপ্রতিম

ফিদেল ক্যাস্ত্রো


ক্রুশ্চেভ এর উত্তর দিয়েছেন ৩০ অক্টোবর:

প্রিয় কমরেড ফিদেল ক্যাস্ত্রো,

আপনার ২৮ অক্টোবরের পত্র হস্তগত হয়েছে, সেইসাথে আমাদের রাষ্ট্রদূতের সাথে আপনার ও প্রেসিডেন্ট ডর্টিকোসের পৃথক আলাপচারিতার বিষয়বস্তুও। আমরা বুঝতে পারছি আপনার জন্য বেকায়দাকর একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, কারণ কিউবা থেকে ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা প্রত্যাহারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। এগুলোর আক্রমনাত্মক চরিত্রকে প্রাধান্য দিয়ে এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। তবে তার বিনিময়ে কিউবায় যুক্তরাষ্ট্র কিংবা পশ্চিম গোলার্ধে তার কোনো মিত্রদেশ আগ্রাসনের পরিকল্পনা থেকে দূরে থাকবে এমন প্রতিশ্রতি আদায় করেছি, সেইসাথে শীগগিরই নৌ অবরোধ তুলে নেয়ার প্রতিশ্রুতিও। এর মধ্য দিয়ে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে বিরোধের নিষ্পত্তি হয়েছে, যেটি আপনি জানেন কতোটা জটিল আকার ধারণ করেছিল। দুই পরাশক্তির মুখোমুখি অবস্থানে আসা এবং অসংযত আচরণে তৃতীয় মহাযুদ্ধ বাধার এবং পারমানবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি ছিল। আমাদের রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে যতোটা বুঝতে পেরেছি, কিউবান জনগণ ক্ষেপণাস্ত্র প্রত্যাহারের ঘোষণা ছাড়া অন্য যেকোনো বিবৃতি শোনার জন্য তৈরি। এছাড়া এমন মতামতের কথাও জানতে পেরেছি যে, বিদ্যমান ইস্যূ এবং ঘটনাগুলো নিয়ে আমরা যথেষ্ঠ প্রস্তুতিমূলক বা 'প্রাক' আলোচনা করিনি। আমাদের মধ্যে কি আলোচনা সংঘটিত হয়নি? এই তারবার্তাকে আমরা চুড়ান্ত সতর্কতা বলে ধরে নিয়েছি। যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল এবং প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে সমরপ্রিয় ও বলগাহীন মার্কিন সেনা কর্মকর্তারা কিউবায় আক্রমণ চালানোর জন্য যে বুভুক্ষু দৃষ্টিতে সুযোগের অপেক্ষায় ছিল, তা আমলে না নিয়ে যদি আলোচনা চালিয়ে যেতাম সময় নষ্ট হতো এবং তাদের হাতে আক্রমণের সুযোগ বা ছুতাও তুলে দেয়া হতো। আমরা মনে করি, কিউবায় মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের ঘটনা নিয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের মধ্যে একটা বদ্ধ সংস্কার তৈরি হয়েছে। তারা ভীত এই ভেবে যে, এসব ক্ষেপণাস্ত্র যেকোনো সময় ব্যবহার করা হবে তাদের উপর। এই ভীতি দূর করার জন্য ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ধ্বংস করতে বোমা হামলা অথবা কিউবা দখল করতে সর্বাত্মক আক্রমণে যাওয়া তাদের পক্ষে অচিন্তনীয় হবে না। এই প্রেক্ষিতে, আমি পূনরুচ্চারণ করে বলি, আপনার সতর্কতা যথার্থ এবং সময়োপযোগী। ২৭ অক্টোবরের বার্তায় আপনি প্রস্তাব দিয়েছেন শত্রু ভূখন্ডে প্রথম পারমাণবিক আঘাত যেন আমরা হানি। আপনি নিশ্চয়ই আন্দাজ করতে পারেন এর পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। এটা কোনো সাধারণ হামলা হবে না, বরং পারমাণবিক তৃতীয় মহাযুদ্ধে রূপ নেবে। তবে এমন প্রস্তাবের পেছনে আপনার মূখ্য উদ্বেগটি দূর্বোধ্য নয়। আমরা একটি জটিল সময়ের মধ্য দিয়ে গেছি, যখন যেকোনো সময় একটি পারমাণবিক মহাযুদ্ধের ঘন্টা বেজে যেতে পারতো। আর তেমনটি হলে নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্র অভাবনীয় ক্ষয়ক্ষতির শিকার হতো, কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং অবশিষ্ট সমাজতন্ত্রি শিবির কী অক্ষত থাকতো? কিউবা এবং কিউবান জনগণের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে এই প্রশ্ন করা কি অসমীচীন হবে যে, তাদের পরিণতিই বা কোথায় গিয়ে দাঁড়াতো? এমন অবস্থায় সর্বাগ্রে আগুনে পুড়ে নিশ্চিহ্ন হওয়ার কথা কিউবার। সন্দেহ নেই যে অসম সাহসিকতার সাথে লড়াইয়ের দিকে এগিয়ে যেতো কিউবানরা, কিন্তু বীরের মতো হলেও তাদের ধ্বংস কেউ আটকাতে পারতো না। এক্ষণ আমাদের গৃহিত ব্যবস্থার ফল হিসেবে যা অর্জিত হয়েছে সেটি আর কিছুই নয়, কিউবায় ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের প্রাক্কালে যেসব লক্ষ্য স্থির করেছিলাম সেগুলোই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এমন প্রতিশ্রুতি আদায় হয়েছে যে, তারা নিজেরা কিংবা কোনো মিত্রকে কিউবায় আক্রমন থেকে বিরত রাখবে। পারমাণবিক অস্ত্রের ট্রিগার না চেপেই এই প্রতিশ্রুতি আদায় করা গেছে। স্বাভাবিকভাবে কিউবা এবং সমাজতন্ত্রি শিবিরের অন্যান্য দেশের নিরাপত্তার প্রশ্নে আমরা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ভেটো ক্ষমতার উপর নির্ভর করে থাকতে পারি না। আমাদের সামষ্টিক নিরাপত্তার জন্য যথোচিত ব্যবস্থা অতীতেও নিয়েছি, ভবিষ্যতেও নেবো যখনই পাল্টা আঘাতের প্রয়োজন হবে। আমরা বিশ্বাস করি হানাদাররা পরাজিত হয়েছে। তারা কিউবায় আক্রমণের পায়তারা করছিল, আমরা থামিয়ে দিয়েছি এবং বিশ্বকে জানাতে বাধ্য করেছি যে, এই পর্যায়ে এমন কাজ করবে না। একে মহান জয় হিসেবে গণ্য করছি। সাম্রাজ্যবাদীরা অবশ্যই কম্যুনিজমের বিরুদ্ধে তাদের লড়াইয়ে ইস্তফা দেবে না সত্য, কিন্তু আমাদেরও নিজস্ব পরিকল্পনা আছে এবং তা ধরেই অগ্রসর হচ্ছি। এই যাত্রা ততোদিন চলবে যতোদিন এই বিশ্বে দু'টি প্রতিযোগীতাপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার অস্তিত্ব থাকবে এবং সেই মুহুর্ত পর্যন্ত যখন দুই শক্তির মধ্যে একটি, আমার বিশ্বাস সেটি আমাদেরটিই, বিশ্ব জয় করছে।

কমরেড ফিদেল ক্যাস্ত্রো,

আমরা আপনার সম্ভাব্য সকল সাফল্য কামনা করি এবং আমাদের বিশ্বাস আপনি তা অর্জন করবেন। আপনার বিরুদ্ধে এখনও ষড়যন্ত্র চলছে। তবে আপনি এবং কিউবান জনগণের সাথে আমরাও প্রত্যাশা করি এসব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিয়ে কিউবান বিপ্লবকে শক্তিশালী ও বাস্তবায়িত করতে এগিয়ে যাবেন। 

এন, ক্রুশ্চেভ


৩১ অক্টোবর লেখা শেষ চিঠিতে নিম্নোক্তভাবে আমি ক্রুশ্চেভের উত্তর দিয়েছি:

প্রিয় কমরেড ক্রুশ্চেভ,

আপনার ৩০ অক্টোবরের চিঠি হস্তগত হয়েছে। এটা আপনার দৃষ্টিভঙ্গি যে, কৌশলগত পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র প্রত্যাহারের আগে আমরা বাস্তবে মতবিনিময় করেছিলাম। যার ভিত্তি হিসেবে আপনি উল্লেখ করেছেন কিউবা থেকে প্রাপ্ত সংবাদ এবং আমার ২৭ অক্টোবরের তার বার্তাটি। আমার জানা নেই আপনি কিউবা থেকে কোন ধরনের খবর পাওয়ার কথা বলেছেন। আমি কেবল আমার ২৬ অক্টোবর রাতে পাঠানো বার্তাটির উল্লেখ করছি, যেটি আপনার হাতে পৌঁছায় ২৭ অক্টোবর। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আমরা যা করেছি, কমরেড ক্রুশ্চেভ, তা হলো লড়াইয়ের জন্য নিজেদের তৈরি করা। কিউবায় কেবলমাত্র একটি সতর্ক সংকেত বাজানো হয়েছিল, যার মাধ্যমে জনগণকে অস্ত্র তুলে নেয়ার আহবান জানানো হয়। আমাদের বিচারে যখন সাম্রাজ্যবাদী হামলা সন্নিকট মনে হয়েছে তখনই তা সোভিয়েত সরকার এবং সামরিক কমান্ডকে জানানো যুক্তিসিদ্ধ মনে করেছি; যেহেতু কিউবার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সোভিয়েত বাহিনী আমাদের সেনাবাহিনীর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করছে। এমন এক আক্রমণ ঘনিয়ে আসছে যা থামানোর সক্ষমতা না থাকলেও প্রতিরোধ লড়াইয়ের সামর্থ্য আমাদের ছিল। বিপদ বা ঝুঁকি আমাদের নিরুৎসাহিত করতে পারেনি। কারণ আমরা জানি যে, আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির উপর তা ঝুলে আছে বহু বছর ধরে এবং এর সাথে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আকস্মিক, বিনা নোটিশে এবং নিঃশর্তভাবে ক্ষেপণাস্ত্র প্রত্যাহারের খবরে বহু সোভিয়েত এবং কিউবানের চোখ থেকে অশ্রু নেমে এসেছে যারা সর্বোচ্চ সম্মানের মৃত্যুবরণ করার জন্য তৈরি ছিল। দেশপ্রেম এবং মানবতার জন্য নিজেদের দায়িত্ব পালনে কিউবান জনগণ কোন স্তরের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল তা আপনি কখনোই জানতে পারবেন না। আপনার কাছে লেখা আমার কথাগুলোর অর্থ উপলব্ধিতে আপনি ভুল করতে পারেন এই বিষয়ে আমি অচেতন ছিলাম না। এবং আপনি তাই করেছেন। হতে পারে আপনি ওগুলো ধীরে এবং মনোযোগ সহকারে পড়েননি, হতে পারে অনুবাদের দোষে, হতে পারে আমি খুব অল্প বাক্যে খুব বেশি কিছু বোঝানোর চেষ্টা করেছি বলে। যাই হোক, লিখতে গিয়ে এক মুহুর্ত দ্বিধা করিনি। আপনার কি ধারণা কমরেড ক্রুশ্চেভ যে আমরা স্বার্থপরের মতো নিজেদের কথা ভাবছিলাম এবং আমাদের দেশে যে মহারণের মহাযজ্ঞ চলছিল তা অজ্ঞানতাপ্রসূত ছিল? আমরা জানতাম...কখনো মনে করবেন না আমরা জানতাম না যে, আমরা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হতে পারি, আপনি সূক্ষ বক্রোক্তির মাধ্যমে অনুগ্রহপূর্বক যেটি উল্লেখ করতে ভুলেননি যে একটি পারমাণবিক তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হতে পারতো। তথাপি ক্ষেপণাস্ত্র প্রত্যাহারে আপনাকে অনুরোধ জানাতে তা আমাদের প্রলুব্ধ করেনি। যেমনটি করেনি তা মোতায়েনের আগেও। আপনার কি ধারণা আমরা এই যুদ্ধ চেয়েছিলাম? কিন্তু যদি তারা আক্রমণ করে বসতো তাহলে তা এড়ানো যেতো কিভাবে? এটা সম্পূর্ণ সম্ভবপর ছিল যে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তি সমাধানের সকল চেষ্টা নস্যাৎ করে একটি আক্রমণ শুরু করে দিয়েছে এবং আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে বলবো তাদের দাবী অগ্রহনযোগ্য ছিল, সোভিয়েত এবং কিউবান উভয়ের জন্যই। এবং এরকম একটি ঘটনা সূচিত হলে ওই যুদ্ধ পাগল মানুষগুলোকে নিয়ে কী করা যেতো? আপনি নিজেই বলেছেন চলতি অবস্থার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হতে পারে পারমাণবিক যুদ্ধ। আমার অবস্থান হলো এই যে, শেষ পর্যন্ত আক্রমণ করে বসলে আক্রমনকারী যেনো পরমাণু অস্ত্রের ট্রিগারে প্রথম আঙ্গুল স্পর্শ করার সুযোগ না পায় সেটি নিশ্চিত করা। এবং আমি জ্ঞানত আপনাকে আগ্রাসী হওয়ার কোনো পরামর্শ দিইনি, দিই না। কারণ তা হবে ভুলের থেকেও খারাপ। তা হবে নৈতিকতা বর্জিত এবং আমার মানসিকতার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। যে পরামর্শ আপনাকে দিয়েছিলাম তা হলো - যদি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি কিউবায় আক্রমন করেই বসে এবং কিউবায় মোতায়েন থাকা সোভিয়েত সেনা ও অস্ত্র স্থাপনার উপর যদি আঘাত করেই ফেলে, তাহলে তাদের জবাব দিতে হবে চুড়ান্ত ধ্বংসাত্মক রূপে। আমি আপনাকে, কমরেড ক্রুশ্চেভ এমন বুদ্ধি দিইনি, কিন্তু আপনার বার্তা পড়ে মনে হয়েছে আমি দিয়েছি যে, ইউএসএসআর সংকটের মাঝখানে আক্রমণ করে বসুক। বরং আমি বলেছি সাম্রাজ্যবাদী যুক্তরাষ্ট্র যদি আক্রমণ করে বসে তাহলে তাকে পাল্টা আঘাতে দ্বিধা করবেন না এবং আপনার আগে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ যেনো সে না পায়। এবং এই ভাবনা থেকে আমি আপনাকে প্রথম পরমাণু আক্রমণের কথা বলেছি কমরেড ক্রুশ্চেভ, এই কারণে আমি নিজের অবস্থানকে সংগত মনে করি, যৌক্তিক মনে করি, এখনও। আর আপনি আমাকে বোঝাতে পারেন যে, আমি ভুল বলেছি। কিন্তু আমাকে না বুঝিয়েই ভুল বলেছি একথা বলতে পারেন না। আপনি বিস্মিত হতে পারেন যে, এমন করার কী অধিকার ছিল আমার? আমি আপনাকে জানিয়েছি কোনো কিছু না ভেবেই, এটি কেমন কন্টকময় হতে পারে তা না ভেবেই; বিবেকের তাড়নায়, যা একজন বিপ্লবীর সাথে মানানসই যে কীনা সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি সর্বোচ্চ নিঃস্বার্থ আনুগত্য ও ভালোবাসার দ্বারা অনুপ্রাণিত। আমি জানি না কিভাবে একথা বলা যায় যে, ক্ষেপণাস্ত্র প্রত্যাহারের পূর্বে আমরা মতবিনিময় করেছিলাম। এমন বাস্তবতায় একটা ভুল করার চেয়ে সেই সুযোগের থেকে অন্য কিছুর বড় কাঙাল আর হতে পারতাম না। আমি কামনা করি আপনিই পুরোপুরি সঠিক ছিলেন। এটি কেবল অজস্র কিউবান নয়, অগনিত কিউবান, যারা ভগ্নহৃদয় এবং তিক্ততার গভীরে নিমজ্জিত হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদীরা ইতিমধ্যে আবারো আক্রমণের সম্ভাব্যতার উপর কথাবার্তা শুরু করে দিয়েছে, তাদের প্রতিশ্রুতি কতো ক্ষণস্থায়ী আর আস্থা কতো নড়বড়ে তার-ই প্রমাণ দিতে। কিন্তু আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদীকে ঠেকাতে আমাদের ইচ্ছা ও মনোবল এতটুকু টলেনি এবং সম্ভবত যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি মজবুত হয়েছে। আমরা প্রতিকূল পরিস্থিতির বিরুদ্ধে লড়বো। বর্তমান বাধা-বিপত্তিকে জয় করবো আমরা। এবং সামনে এগিয়ে যাবোই। আর ইউএসএসআরের সাথে আমাদের বন্ধুত্ব এবং তাদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতায় কেউ কোনোদিন চিড় ধরাতে পারবে না।

ভ্রাতৃপ্রতিম

ফিদেল ক্যাস্ত্রো

Comments

Popular posts from this blog

চাড্ডিগণ [এক]

পাকিস্তান ও ইজরায়েল

বাম রঙ্গ [পর্ব-এক]