ক্যাস্ট্রোবাদ [পর্ব-দুই]
ফিদেল তার সাক্ষাৎকার ভিত্তিক আত্মজীবনীতে স্বীকার করেছেন মার্ক্সবাদের তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জনের তেমন সুযোগ তার হয় না। তারপরও তিনি নিজেকে 'মার্ক্সবাদী' হিসেবে সবসময় দাবী করলেও সাক্ষাৎকার দেয়ার সময় একটু পর পর 'ভাগ্যের' কথা উল্লেখ করেছেন যা বইটি পড়ার সময় যে কারো চোখেই ধরা পড়বে। তিনি বিপ্লবে অবদান রাখা কিংবা কিউবার ইতিহাসের অন্যান্য ক্ষেত্রে অবদান রাখা কালোদের প্রসঙ্গ আসলে সবসময় এভাবে বলেছেন "কালো হলেও...."। তিনি কতটা মার্ক্সবাদী (!) তা জানতে 'My Life: A Spoken Autobiography' বইটি থেকে নিচের লাইনগুলো পড়াই যথেষ্ট।
তদন্তকারীদের জিজ্ঞাসাবাদে সে নিজেকে 'কমিউনিস্ট' বলে পরিচয় দেয়। ব্যস, যা হবার তাই হলো। মেক্সিকোর সব সংবাদপত্রে পরের দিন খবর বেরুলো যে আমরা একদল নৈরাজ্যবাদী কমিউনিস্ট এবং এই মহাদেশে গণতন্ত্র নস্যাতের ষড়যন্ত্র করে বেড়াচ্ছি। আরোও কী কী লিখেছে আমার জানা নেই...। চে'কে প্রসিকিউটরের সামনে হাজির করা হলে দেখা গেলো তার সাথে যুক্তিতর্কে পেরে উঠছেন না প্রসিকিউটর। কীর্তিমান ব্যক্তিবর্গের ব্যক্তিত্ব ও দোষগুণ টেনে আনলো চে। স্ট্যালিনের সমালোচনা করতে লাগলেন। কল্পনা করুন, মেক্সিকোর পুলিশ, প্রসিকিউটর, তদন্তকারীদের সাথে স্টালিনের ভুল নিয়ে তত্ত্বীয় আলোচনা চালাচ্ছেন চে গুয়েভারা! এই ঘটনা ১৯৫৬'র জুলাই মাসের। আর একই বছরের ফেব্রুয়ারীতে স্ট্যালিনের বিষোদগার করেছেন ক্রুশ্চেভ। কমিউনিজমের পক্ষ নিয়ে অনলবর্ষী যুক্তি তর্ক চালিয়ে গেলেন চে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পার্টি কংগ্রেসে যে কমিউনিজমের কথা বলা হয়েছে সেটার ধ্বজা ধরে! একবার ভেবে দেখুন নিজেকে কতোটা ঝুঁকির মধ্যে নিক্ষেপ করেছেন অবলীলায়, আর আর্জেন্টাইন হিসেবে সেই ঝুঁকি আরোও বেশি তার জন্য। পরে আমি ভেবেছি এটা নিয়ে। যখন কোনো কিছুই আপনার নিয়ন্ত্রণে নেই, পুরো প্রকল্পই যখন বিপদের মধ্যে, তখন বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয়াই সর্বোত্তম। কিন্তু চে, যে কীনা কমিউনিস্ট তত্ত্বের দ্বারা ভীষণ প্রভাবিত, তিনি এই ট্যাক্টিক্যাল এ্যাপ্রোচে গেলেন না। এটি আমাদের সাথে তার কিউবায় যাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হতে পারেনি অবশ্য। মুক্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে সর্বশেষ দু'জন ছিলাম আমি আর চে। তার কয়েকদিন আগে আমাকে মুক্তি দেয় মেক্সিকো সরকার। ল্যাজারো কার্ডেনাসের অনুকম্পায় এটা সম্ভব হয়েছিল। তিনি কিউবান কয়েদিদের পক্ষে হস্তক্ষেপ না করলে আমাদের ভাগ্যে কী ঘটতো কে জানে। তার নামে কিউবানরা পূজো করে রীতিমতো!
ট্রটস্কির মতবাদের প্রতিও চে'র দূর্বলতার কথা অনেকে বলে থাকেন? এ বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
না, না। তা নয়। আমি যাচ্ছি সে প্রসঙ্গে। চে কেমন ছিলেন বলছি আপনাকে। আমি ইতিপূর্বে যেমনটি বলেছি, চে'র রাজনৈতিক শিক্ষা ছিল উল্লেখযোগ্য স্তরের। স্বভাবজাত কারণে বহু বইপত্র পড়া হয়েছে তার। কার্ল মার্ক্স, ফ্রেডেরিখ এঙ্গেলস, ভ্লাদিমীর লেনিন প্রমুখ ব্যক্তিদের তত্ত্ব সম্পর্কে যথেষ্ঠ পড়াশোনা করেছেন। স্ব-স্বীকৃত মার্ক্সবাদী। কিন্তু কখনোও ট্রটস্কি সম্পর্কে কথা বলতে শুনিনি তার মুখে। তিনি মার্ক্সকে সমর্থন করতেন, লেনিনের সমর্থনেও কথা বলতেন, আক্রমণ করতেন স্ট্যালিনকে। কিংবা হয়তো এটা ছিল ব্যক্তিত্ব পছন্দ করা না করার বিষয়। স্ট্যালিনের সমালোচনা করলেও কোনো কোনো প্রসংগে তার প্রশংসাও করেছেন। কিন্তু বিশ্বাস করুন, ট্রটস্কির বিষয়ে একটি কথাও নয়। ভেতরে ভেতরে আমি চে'র থেকেও বেশি কট্টর স্ট্যালিন সমালোচক। এর মূল কারণ স্ট্যালিনের কতগুলো ভুল। ১৯৪১ এ সোভিয়েত ভূখন্ডে হিটলারের যুদ্ধ মেশিন প্রবেশের দায় আমি ষ্ট্যালিনের ঘাড়ে চাপাবো। বসেছিল কেন সোভিয়েত বাহিনী? তার আরোও বহু ভুল ক্ষমার অযোগ্য। সবাই জানে তিনি একজন ক্ষমতার অপব্যবহারকারী, নিপীড়ক ছিলেন। তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কথাও কারুর অজানা নয়। অধিকাংশ মানুষই তার ব্যক্তিত্বের পূজারি নন, যেমনটি লেনিনের। তারপরেও বলবো সোভিয়েত ইউনিয়নকে শিল্পায়ণের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা অগ্রগণ্য। সামরিক শিল্পস্থাপনাকে সাইবেরিয়ায় স্থানান্তরে তার সিদ্ধান্ত নাৎসীবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের লড়াইকে শক্তি যুগিয়েছে। স্ট্যালিনের আলোচনায় এটি যেমন ইতিবাচক, তার গুণকীর্তনের মতো শোনায়, তেমনই তার মারাত্মক ভুলের মাশুল দিতে হয়েছে রেড আর্মিকে, ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের মুখে অপ্রস্তুত থাকার জন্য।
তিনি নিজেকে নিরস্ত্র করে রেখেছিলেন?
নিরস্ত্র, নিরাপত্তাহীন বা দূর্বল করে রেখেছিলেন। শুধু তাই নয়, সেই ভয়ানক জার্মান-সোভিয়েত চুক্তিতেও সই করেছিলেন, মলোটভ-রিবেনট্রপ চুক্তি নামে যেটি পরিচিত। এ বিষয়ে আগেও বলেছি, নতুন কিছু যোগ করতে চাই না এখন।
...........................................................................................
স্ট্যালিনের শুদ্ধি অভিযানের বিপরীতে একই বইয়ে তার জগাখিচুড়ি মার্কা মন্ত্রীসভার ব্যাপারে স্বীকারোক্তি-
২৬ জুলাই আন্দোলনকারীরা উরুতিয়াকে প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়নে নিরঙ্কুশ সমর্থন দিলো, আমরাও সবার রায়কে সম্মান জানালাম। তিনি এবং আন্দোলনকারীরা মিলে মন্ত্রীসভার নিয়োগাদি চুড়ান্ত করলো। লিডারশীপ ক্যাডারে এমন সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হলো যারা উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণী, এমনকি কেউ কেউ এসেছে ডানপন্থি শিবির থেকে। বামফ্রন্টের তো ছিল-ই। এদের মধ্যে অনেকেই পরবর্তীতে স্মৃতিকথা লিখেছেন, অনেকেই বিপ্লবের সাথে থেকেছেন। তাদের বলার মতো অনেক আকর্ষণীয় বিষয় ছিল এবং প্রত্যেকেই ভাবনার ব্যাপারে স্বাধীন ও সৎ ছিলেন। ক্যামিলো এবং চে'র সাথে আলাপের ব্যাপারেও।
এই নেতাদের কাউকে কাউকে অবিশ্বাস করতেন চে?
কিছু লোকের ব্যাপারে চে আস্থাহীন এবং সন্দেহপরায়ণ ছিলেন। এর কারণ ১৯৫৮ সালের এপ্রিল ধর্মঘটে তিনি কিছু সমস্যা দেখেছেন। ভিলা ক্লারায় ২৬ জুলাই আন্দোলনের যেসব নেতাদের সাথে কথা হয়েছিল, তাদেরকে তখনই বুর্জোয়া বলে সন্দেহ হয় তার। চে বরাবরই কৃষিভিত্তিক সংস্কারের পক্ষে ছিলেন। অন্যদের মধ্যে ক্ষতিপূরণ এবং দায়মুক্তি নির্ভর আধুনিক সংস্কারের পাল্লাই ভারী।
...........................................................................................
সমাজতন্ত্রের কাজ কি প্রাচীনপন্থী প্রথাগুলোকে প্রশ্রয় দেয়া নাকি সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মাধ্যমে দেশের মানুষকে বিজ্ঞানের চেতনায় সমৃদ্ধ করা? উপমহাদেশের নির্বাচনপন্থী বামেদের অনুরূপ আচরণই প্রদর্শন করেছেন ক্যাস্ট্রো এক্ষেত্রে।
তৃতীয়ত: সমকামীদের নিয়ে এক ধরণের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। তাদের সেনাবাহিনীর চাকুরীতে নিয়োগ করার অনুমতি ছিল না। এর ফলে সমকামীদের দিক থেকে প্রবল চাপ এলো। এবং বিপ্লবোত্তর যে সময়কালের কথা বলছি সেসময় আমাদের সমাজে মাচিসমোর অস্তিত ছিল ব্যাপক। এবং সমকামীদের সামরিক পেশায় নেয়ার বিরোধীতাও ছিল প্রবল। এসব কারণে সামরিক চাকুরী সমকামীদের জন্য নিষিদ্ধ রাখতে হয় আমাদেরকে, আর এটাই পরিণত হয় আমাদের ক্ষতস্থানে। সমকামীদের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় ত্যাগ স্বীকার থেকে অব্যাহতি দেয়ার দৃষ্টিভঙ্গিতে ফেলে সমালোচনার তীর ছোঁড়া শুরু করলো একদল। খুব কঠিন ভাষায় সমকামীদের উপর আক্রমণ আসতে লাগলো। এই ত্রিবিধ অথবা কোনো একটি কারণে সেনাবাহিনীর চাকুরীতে অযোগ্য ব্যক্তিদের জন্য গঠন করা হলো 'ইউনিদাদেস মিলিটারেস দো আয়ুদা আ লা প্রদুকসিওঁন বা UMAP' (মিলিটারি ইউনিটস টু এইড প্রডাকশন)। এই তিন ধরনের লোককে এই ইউনিটে পাঠানো হলো। এটাই হলো বাস্তব ঘটনা।
..............................................................................................
মূলনীতিটা ছিল এমন যে, 'ধর্মে বিশ্বাসীরা দলের কোনো পদের জন্যে যোগ্য' বিবেচিত হবে না। তাদের রাজনৈতিক অবস্থানের বিচারে তাদের প্রতি যথোচিত সম্মান প্রদর্শন করা হবে, কিন্তু দলের পদ দেয়া হবে না। এই মূলনীতিকে নিষ্ফল মনে করার কিছু নেই। যদিও আসন্ন বছরগুলোতে ধর্ম বিশ্বাসীদের জন্য দলের দরজা খুলে দিতে আমরা বাধ্য হই।
..............................................................................................
যদিও দল গঠনের সময় ধর্মে বিশ্বাসীদের বাদ দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আমার মনে ভিন্নমত ছিল। বিশ্বাসীদের দলে নেয়ার সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থনকারী প্রথম সারির ব্যক্তিদের একজন আমি। ত্রিশ বছরেরও বেশি আগে, 'স্বাধীনতার ধর্মমতের (লিবারেশন থিয়োলজি)' সংস্পর্শে আসি। ১৯৭১ সালে, চিলিতে প্রথম এই মতানুসারীদের মুখোমুখি হই। বিভিন্ন অঞ্চলের, বিভিন্ন মতের পাদ্রি এবং যাজকদের সাথে কথা হয়। তাদের সাথে সাক্ষাত হয় কিউবান দূতাবাসে। কয়েক ঘন্টা আলাপের পর তাদের জানাই যে, 'অনেকদিন ধরে ভাবছি বিশ্বাসী এবং অবিশ্বাসীদের (আস্তিক এবং নাস্তিক) মধ্যে একটা ঐক্য স্থাপন করা যায় কীনা'। অর্থাৎ মার্ক্সবাদী এবং বিশ্বাসীদের মধ্যে ঐক্য স্থাপন, বিপ্লবের স্বার্থে।
যেমন সান্দিনিস্তানরা বলতো: খ্রিস্টবাদ এবং বিপ্লবের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই?
আমরা আরোও আগে বলেছি। কারণ লক্ষ্য করলে দেখবেন, স্যান্দিনিস্তা বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে ১৯৭৯ সালে, আর এই মতবাদের প্রতি আমার সমর্থন জানিয়েছি তার আগে, যখন যেখানে গিয়েছি। ১৯৭১ সালে চিলিতে সালভাদর আলেন্দের সাথে কিংবা ১৯৭৭ সালে জ্যামাইকায় মিকায়েল ম্যানলির সাথে সাক্ষাতের কথাই ধরুন। আমরা যে নীতি অনুসরণ করছিলাম, এ হলো তাই। স্বাধীনতার ধর্মমতের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি গীর্জাকেই বেশ উদারমনা মনে হয়েছে আমাদের। 'আমাদের গোলার্ধে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের স্বার্থে যে মার্ক্সবাদ এবং খ্রিস্টবাদের মধ্যে ঐক্য স্থাপন করা আবশ্যক', আসন্ন বক্তৃতা-বিবৃতিতে এই বাক্যটি ঘোষণা করার জন্য আমি তৈরি।....
..............................................................................................
ভূমি সংস্কারে তার সুবিধাবাদী নীতি যেমন ছিল-
যদি অতীতের সব বেআইনি দখল করা সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হয়, তাহলে কিউবায় আর কোনো সম্পদ অবশিষ্ট থাকে না! ফলে, ঐক্যের স্বার্থে এক প্রকার 'দো ফ্যাক্টো' সাধারণ ক্ষমা জারি করা হলো। ২৬ জুলাই আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত বা এর প্রতি অনুগত এবং বিদ্রোহী আর্মির সবাই এই সিদ্ধান্ত মেনে নিলো।
............................................................................................
তিনি একদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নব্য সোভিয়েতকে বাঁচাতে স্ট্যালিনের চুক্তির সমালোচনা করলেন, আবার নিজেই দ্বিচারিতার চূড়ান্ত পর্যায় প্রদর্শন করলেন নিচের কথাগুলোর মাধ্যমে-
তখন খালি বিদেশী মালিকানাধীন ল্যাটিফুন্ডিওসের পরিমাণ ২,০০,০০০ হেক্টর বা প্রায় ৫ লাখ একর। কিছু আমেরিকান কোম্পানী শুধু বিরাটায়তন জমিরই মালিক ছিল না, বহু আখ সেন্ট্রালেরও। ঐতিহাসিকভাবে আশেপাশের অনেক দেশেই এমন বিস্তর সম্পদের মালিকানা ছিল এসব কোম্পানী ও কর্পোরেশনের। এর মধ্যে কিউবায় তাদের প্রভাব আর ক্ষমতা ছিল পর্বত প্রমাণ। কিন্তু আজ নয় কাল এগুলোকে রাষ্ট্রায়ত্ত করার কোনো বিকল্প আমাদের হাতেও ছিল না। আমাদের পদক্ষেপ বা সংস্কার কর্মসূচীর দ্রুতগতির লক্ষ্য এটি ছিল না যে, মার্কিন কর্পোরেশনগুলোর সাথে শীঘ্রই শত্রুতায় জড়িয়ে পড়ি। সমস্যা ছিল আমাদের প্রথম কৃষি সংস্কার আইন এমন একটি দেশের (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের) কাছে অগ্রহণযোগ্য, কিউবার শ্রেষ্ঠ আখ চাষের জমিগুলোর মালিকানা যে দেশের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে। এই আইন সর্বোচ্চ ১০০ ক্যাবালেরিয়ার অনুমোদন দিতো। আর ১০,০০০ ক্যাবালেরিয়া বিশিষ্ট ল্যাটিফুন্ডিওস, এমনকি এর বেশিও ছিল। উৎপাদনশীল এবং উৎপাদনে নিয়োজিত রয়েছে, এমন ক্ষেত্রে ১০০ ক্যাবালেরিয়া পর্যন্ত অনুমোদন দিতাম আমরা। কিন্তু উৎপাদনশীল নয় বা উৎপাদনে নিয়োজিত নেই এমন ক্ষেত্রে ৩০টির বেশি অনুমোদন না দেয়ার বিধান করা হয়। সোজা কথায় এই আইন বলে কোনো কোম্পানী ১০০ ক্যাবালেরিয়ার বেশি জমির মালিকানা হাতে রাখতে পারবে না এবং সেটিও হতে হবে উৎপাদনশীল। এর মানে দাঁড়ালো একটি কোম্পানীর মালিকানাধীন সর্বোচ্চ জমির পরিমাণ সীমিত থাকবে ১৩৪০ হেক্টর বা ৩,৩০০ একরের সামান্য বেশি। এবং অনুৎপাদনশীল বা উৎপাদনের অযোগ্য জমির পরিমাণ হবে সর্বোচ্চ ৩০ ক্যাবালেরিয়া তথা ৪০২ হেক্টর বা ১০০০ একরের মতো। 'ইতিহাস আমাকে দায়মুক্তি দেবে'র মধ্যে আমি সমবায়ের পাশাপাশি পুনর্বনায়ন, শিল্পায়ন এবং 'স্বর্ণ-বাছুরের উল্লেখ করেছিলাম। আমি প্রতীকি ভাষা ব্যবহার করেছি। সেসময় কোনো কিউবান বিপ্লবীর কর্মসূচীতে কারোও বিশ্বাস ছিল না, যেহেতু বহু কর্মসূচীর নিষ্ফল প্রত্যাবর্তন দেখে তারা অভ্যস্ত। গ্রামাঞ্চলে লক্ষ লক্ষ মানুষ তখন ভূমিহীন। ভাড়া দিতো এমন ক্যাম্পেসিনো ছিল লক্ষাধিক। বাকিদের বলা যেতে পারে জবরদখলকারী। নিয়ম হলো 'যে জমিতে শ্রম ঢালছে, তার উপর কোনো অধিকার বা কর্তৃত্ব থাকবে না তাদের, যেকোনো মুহুর্তে অন্য কোথাও তাদের ছুড়ে ফেলা হতে পারে'। এমন ভূমিহীনদের সংখ্যা বেশি ছিল, নির্দিষ্ট করে বললে পাহাড়ি এলাকায়। কিছু সংখ্যক ছিল ভাগচাষী। এদের অবস্থা ছিল সবচেয়ে হীন। কারণ তাদের শ্রমে-ঘামে উৎপাদিত ফসলের এক-তৃতীয়াংশ বা এর বেশি নিয়ে নেবে ভূস্বামী। এসকল জমির পুনর্বণ্টন ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। বন্টনের জন্য আর একখন্ড জমিও অবশিষ্ট নেই। যেটি করনীয় তা হলো - বিভক্ত ও বন্টনকৃত জমির বৈধতা জারি ও সংশ্লিষ্ট ক্যাম্পেসিনোর পক্ষে মালিকানা নথিভুক্ত করা। এবং আমরা তা করেছি। কোনো অবস্থাতেই আমরা চিনি শিল্পকে নিষ্ক্রিয় করতে চাইনি। সর্বশেষ যেসব জমি জাতীয়করণ করি সেগুলো ছিলো আখ ক্ষেত। সকল ল্যাটিফুন্ডিওসের বড় ল্যাটিফুন্ডিওস এগুলোই। এর চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে বড় আকারের কৃষি কর্পোরেশনগুলোকে সংঘবদ্ধ রাষ্ট্রীয় এন্টারপ্রাইজের অধীনস্ত করায়। বর্তমানে এগুলো 'সমবায়ে' রপান্তরিত হয়েছে। বাস্তবতা হলো, সেই 'বিশেষ সময়ে', যখন জ্বালানী তেল ছিল বেশ দুষ্প্রাপ্য, তখন 'কৃষি শ্রমিকদের'কে এক খন্ড জমি দেয়ার সিদ্ধান্তকে সময়োপযোগী কর্তব্য হিসেবে বিবেচনা করেছি, যাতে খাদ্য শস্য আবাদ করে তাৎক্ষণিক খাদ্যাভাব ও চাহিদা পূরণ করতে পারে। এটি খাদ্য সরবরাহ পরিস্থিতিতে অবদান রেখেছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে যা করেছে আমরা সেদিকে যাইনি। তারা এমনকি রক্ত ঝড়িয়ে বাধ্যতামূলক সংঘবদ্ধকরণ কর্মসূচী বাস্তবায়ণ করতে পিছপা হয়নি।
[এই বিষয়ে পশ্চিমাদের প্রচারিত প্রোপাগান্ডাগুলোর জবাব ব্লগের বিভিন্ন লেখায় দেয়া হয়েছে]
এবং সেটি খুব ফলপ্রসু হয়নি। অপুষ্টি, খাদ্য স্বল্পতার জের বহু বছর অব্দি টানতে হয়েছে।
আমরা দুই খণ্ড জমিকে এক করতে কখনো বলপ্রয়োগ করিনি। বিপ্লবের প্রথম দিন থেকেই আমাদের প্রতিশ্রতি এবং ঘোষণা ছিল ক্যাম্পেসিনোদের ইচ্ছা এবং গুরুত্বকে সম্মান করা হবে। এবং বৃহত্তর কৃষি ইউনিট গঠনের জন্য একজনের জমি তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে অন্যের জমির সাথে জোড়া লাগাতে চাপ দেয়া হবে না। যদিও হেক্টর প্রতি এবং মাথাপিছু হিসেবে উৎপাদনের ক্ষেত্রে এ ধরনের চাপ প্রয়োগের কিছু বাড়তি সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা বায়ছে। কিন্তু চাপ প্রয়োগ বা ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাধ্য করা মানেই সংশ্লিষ্ট ক্যাস্পেসিনোকে ভীতি প্রদর্শন করা, যার ছাপ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। বিশেষ পর্বে (কৃষি সংস্কারের সময়) উদ্বৃত্ত সমবায়গুলো বস্তুত রাষ্ট্রীয় কর্পোরেশনের আওতায় সৃষ্টি হয়েছে, যা আমাদের ইতিমধ্যেই ছিল। এর মধ্যে অনেকগুলোর সামর্থ্য ছিল অসাধারণ এবং কারিগরী ভবিষ্যতও সম্ভাবনাময় যদি বা যতক্ষণ না আমলাভারে ভারাক্রান্ত না হয়ে পড়ে এবং বিরাট বপু হওয়ার উচ্চাভিলাষে না ভাসে। এবং তখনও এসব ঘটেছে বিপ্লবী উৎপাদক হিসেবে আমাদের কঠিন শিক্ষানবীশির সময়। সমস্যা বা অধিকাংশ সমস্যা মোকাবিলায় আমরা সফল হইনি। এর সাথে ছিল সমকালীন কঠিন পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জ, যেমন- প্রতিবেশী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অর্থনৈতিক অবরোধের সাথে আমাদের আদর্শিক স্বপ্নের সংঘাত। এবং হাইব্রিড পুঁজিবাদ ও সমাজবাদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান দ্বন্দ্বও এবং এর ফলে সৃষ্ট দ্বিধা ও বিশৃংখলাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। সবচেয়ে সক্ষম এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক কৃষি উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর জন্ম হয়েছিল ছোটো জমির মালিক এবং স্বাধীন কৃষকদের স্বেচ্ছাপ্রনোদিত বা সচেতন মৈত্রির ফলে। তাদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় ঘরবাড়ি, স্কুল, স্বাস্থ্য সেবা, বন্টন কেন্দ্র, বিদ্যুৎ ও পানি উৎপাদনের জন্য সমবায় ইত্যাদি ক্ষুদ্র অবকাঠামো গড়ে উঠে। এর সুবাদে বহু পরিবারের অনেক বছরের বিচ্ছিন্নতা এবং ত্যাগ স্বীকারের অবসান ঘটে। আজ এতো বছর পর উৎপাদনের বিকল্প ব্যবস্থা আবিষ্কারের পরও তাদের পাশাপাশি অবস্থানে কোনো বিরোধ নেই। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিষয়টা ছিল সবকিছু অথবা কিছুই না। প্রথমে শূন্য রাষ্ট্রায়ত্তকরণ; তা-ও আবার বলপূর্বক এবং অল্প সময়ের ব্যবধানে! এর ফলশ্রুতিই ছিল সংঘাত, সহিংসতা এবং রক্তপাত।
কৃষিক্ষেত্রে সংস্কারের প্রশ্নে আমি খুবই মৌলিক ছিলাম, কি বলবো আপনাকে। কিন্তু মনে রাখবেন, যদি মৌলিক হতে না পারেন, আপনি কিছুই করতে পারবেন না। একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে কুড়ি-পঁচিশটি নির্বাচন করলেন, কিছুই বদলাবে না তাতে। কিন্তু আমি, আমার কাছে মনে হয়েছে পরিবর্তনের জন্য জোরেশোরে একটা ধাক্কা দিতে হবে, কৃষি সংস্কারই হলো সেই ধাক্কা।


Comments