পশ্চিমারা কি আসলেই শ্রেষ্ঠ? (পর্ব-পাঁচ)

 

একটি ট্যাংকের দাম ৪০ লাখ মার্কিন ডলার। এই পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে প্রাণঘাতী অসুখ ঠেকানোর জন্য ৪০ লাখ শিশুকে টিকা দেয়া সম্ভব। একটি শিশুকে প্রাণঘাতী ৬টি রোগের বিরুদ্ধে টিকা দিতে খরচ হয় মাত্র ১ ডলার।

একটি 'মিরেজ ২০০০' যুদ্ধবিমানের দাম ৯ কোটি মার্কিন ডলার। আর একটি শিশুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক বছর পড়ালেখার জন্য গড়পড়তা খরচ হয় ৩০ ডলার। একটি 'মিরেজ ২০০০' যুদ্ধবিমান কেনার খরচের বিনিময়ে ৩০ লাখ শিশুর প্রাথমিক শিক্ষার খরচ মেটানো সম্ভব।

আধুনিক একটি ডুবোজাহাজের দাম ৩০ কোটি মার্কিন ডলার। অথচ এক বছরের জন্য একজনকে সুপেয় পানি সরবরাহ করতে গড়ে ৫ ডলারের মতো ব্যয় হয়। একটি ডুবোজাহাজ কেনার খরচের বিনিময়ে ৬ কোটি লোকের কাছে সুপেয় পানি পৌঁছে দেয়া সম্ভব।


জানা মুহসেন এর নিচের বই দু'টো সেই সমস্ত গন্ডমূর্খের সমতুল্য উপমহাদেশের কথিত মুক্তমনা আর পশ্চিমা প্রেমী লিবারেলদের প্রতি চপেটাঘাত যারা কিনা মনে করে ইরানের মোল্লাতন্ত্রের বলয়ের বিপরীতে সৌদি ও পশ্চিমা বলয়ের শাসকদের অধীনে আরব দেশগুলো থাকলেই নারী মুক্তি সম্ভব। যেই লেখিকার কথা বলছি তার জন্মদাতা দুই বোনকে নিজের দুই বন্ধুর কাছে ইংল্যান্ড থেকে কৌশলে ইয়েমেন নিয়ে গিয়ে বালিকা বধূ হিসেবে বিক্রি করে দিয়েছিল। জানা বহু কষ্টে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও তার বোন এখনো রয়ে গেছে যৌন শোষণের কবলে। তিনি বিস্তারিত লিখেছেন কিভাবে পশ্চিমা বলয়ে থাকা আরব শাসকদের দেশগুলোতে ভয়াবহ দারিদ্রতার কারণে কন্যা শিশুদের তথাকথিত হালাল বিয়ের অজুহাতে যৌন শোষণের জন্য বিক্রি করে দেয়া হয়, অন্যদিকে নারী স্বাধীনতার ঢোল বাজানো পশ্চিমারা এসব শাসকদের নিজেদের স্বার্থে বছরের পর বছর টিকিয়ে রাখে। নারীরা তো বহু দূরের কথা, আরব দেশগুলোর দরিদ্র মানুষদের প্রকৃত মুক্তির ব্যাপারে পশ্চিমাদের বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা কখনোই ছিল না। তিনি এটাও দেখিয়েছেন কিভাবে তার বইয়ের বিক্রয়লব্ধ সিংহভাগ অর্থ লুটেপুটে খেয়েছে এরাই, কিভাবে এদের সরকারগুলো আর আন্তর্জাতিক কমিউনিটিগুলো দায়িত্ব এড়িয়ে যায়।


লাইকা'র জন্য কুমিরের অশ্রু বহুবার বিসর্জন দিয়েছিল পশ্চিমারা। কিন্তু গবেষণার স্বার্থে তারা নিজেরাই বানর, গিনিপিগ এখনো ব্যবহার করে এবং তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর মানুষদের উপর ট্রায়াল দেয় উদ্দেশ্য গোপন রেখে। যেমন- লুই পাস্তুর পর্যাপ্ত পাগলা কুকুর না পেয়ে সুস্থ কুকুর ধরে ধরে সেগুলোর খুলি ফুটো করে মৃত পাগলা কুকুরের এক টুকরো ঘিলু ঢুকিয়ে দিতেন। আবার অ্যানথ্রাক্স রোগের টিকা আবিষ্কার করার জন্য গবেষণার স্বার্থে তার হাতে অনেক গরু মারা যায়।

'সুসভ্য' ফরাসিরা কামানের গোলা মেরে স্ফিংক্সের মুখের একটা অংশ ভেঙে দিয়েছিল। 

[সূত্র: 'যুগের পর যুগ', দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়]

পশ্চিমারা দেশটার কি দশা করেছিল একই বই থেকে তার আরেকটু ঝলক দেখা যাক-

"কাইরো শহর তো পৌঁছলাম অবশেষে। দেখলাম, নীল নদের কিনারা জুড়ে বিরাট বিরাট আকাশ ছোঁয়া প্রাসাদ। কিন্তু মিশর কোথায়? সেসব প্রাসাদের কোথাও তো মিশরের ছিটেফোঁটা চোখে পড়ে না। সেগুলো হলো হাল ফ্যাশানের মার্কিনী প্রাসাদ; তার কোনোটার মালিক ইংরেজ, কোনোটার বা মার্কিন। দুনিয়াজোড়া যাদের ব্যবসার জাল, তারা। চওড়া পিচের পথ ঝকঝক করছে, মস্ত বড়ো বড়ো হাল আমলের গাড়ি হুস হুস করে ছুটে চলেছে তোমার পাশ দিয়ে। আর তোমার মনে হবে, মার্কিন দেশেরই একটা টুকরো বুঝি কেটে এনে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে এই নীল নদের কিনারায়। মিশর কোথায়? হুঁশ হবে ভিখিরির ডাকে। রাস্তা ভরা ভিখিরি। পৃথিবীর আর কোথাও বুঝি অন্ধ মানুষের এমন ভিড় নেই। খাবারের অভাব, ভিটামিনের অভাব - মানুষের চোখ তাই পঙ্গু হয়ে গিয়েছে। দেশের যেসব গৌরব দেখবার জন্যে সাত সমুদ্রের ওপার থেকে হাজার পর্যটকের নিত্যি আনাগোনা সেই সব চিহ্নের কিছুই চোখে পড়বে না ওই দেশেরই হাজার হাজার ছেলেমেয়ের। ভিখিরির পাল হয়ে তারা পর্যটকদের পেছু নেয়।"

এলিফ শাফাক এর 'Apathy' শিরোনামের একটা নন ফিকশন আর্টিকেল থেকে জানা যায় সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে ইউরো জোনে ঢোকার পর কিভাবে ব্যাপক মাত্রায় হাঙ্গেরিতে নাৎসি সমর্থক উগ্রবাদী তরুণ প্রজন্মের সৃষ্টি হয়েছে ইউক্রেনের মতোই। 'অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্করী' প্রবাদকে বারবার প্রমাণিত করতে উপমহাদেশের কথিত মুক্তমনারা পূর্ব ইউরোপের মুসলিম বিদ্বেষীতাকে সাধুবাদ জানালেও এই আর্টিকেল থেকে জানা যায় নাৎসি প্রীতি ধারণকারী উগ্র এই তরুণরা রোমানি জাতির মানুষদের নিয়মিত নিপীড়ন করে।

"একটি মানুষের শিশু বয়স থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত মানবিক গুণের ক্রমবিকাশের বিষয়ে উন্নততর দেশগুলোতে বহু পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানো হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। ওইসব দেশের মনোবিজ্ঞানী ও চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এখন স্বীকার করেই নিয়েছেন - মানুষের বংশগতি সূত্রে প্রাপ্ত অধিকাংশ অবৈশিষ্ট্যই পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত। সেই কারণে "মানবিক গুণের বিকাশে কার প্রভাব বেশি - বংশগতি অথবা পরিবেশ?” এই জাতীয় শিরোনামের বিতর্কে ওসব দেশের বিজ্ঞানীরা আজকাল আর অবতীর্ণ হন না, এককালে যেমনটি হতেন। তবে এখনও এদেশের বহু চিকিৎসা বিজ্ঞানী বংশগতিকে অধ্যধিক বা চূড়ান্ত গুরুত্ব দিতে গিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে যেসব তথ্য সংগ্রহ করেছেন তাকেই অস্বীকার করে বসেন, নাকচ করে দেন। এমনটা করার কারণ সম্ভবত আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতি বিষয়ে খোঁজখবর না রাখা। একসময় বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করার পর প্রতিষ্ঠা পেতেই নিশ্চল হয়ে যাওয়া। বিজ্ঞানীরা কিন্তু বর্তমানে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, বিগত বহু হাজার বছরের মধ্যে মানুষের শারীরবৃত্তিক কোনও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। এই কম্পিউটার যুগের আধুনিক সমাজের মানবশিশুর সঙ্গে বিশ হাজার বছর আগের ভাষাহীন, কাঁচা মাংসভোজী সমাজের মানবশিশুর মধ্যে জিনগত বিশেষ কোনও পার্থক্য ছিল না। অর্থাৎ সেই আদিম যুগের মানবশিশুকে এ যুগের অতি উন্নততর বিজ্ঞানে অগ্রবর্তী কোনও সমাজে বড় করতে পারলে ওই আদিম যুগের শিশুটি আধুনিকতম উন্নত সমাজের গড় মানুষদের মতোই বিদ্যে-বুদ্ধির অধিকারী হতো। হয় তো গবেষণা করতো মহাকাশ নিয়ে অথবা সুপার কম্পিউটার নিয়ে। অর্থাৎ অনুকূল পরিবেশে শিশুকাল থেকে বেড়ে ওঠার সুযোগ পেলে এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকান দেশের নিরন্ন, হতদরিদ্র, মূর্খ মানুষগুলোও হতে পারে ইউরোপ, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র বা জাপানের উন্নত প্রযুক্তিবিদ্যার মধ্যে গড়ে ওঠা মানুষগুলোর সমকক্ষ। অবশ্য ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের জন্য স্বাতন্ত্র্যতা নিশ্চয়ই থাকতো, যেমনটি এখনও থাকে।"

- 'মনের নিয়ন্ত্রণ : যোগ-মেডিটেশন', প্রবীর ঘোষ


আগের শতকগুলোতে ইউরোপের ধনীরা যুদ্ধে যোগ দেয়া এড়াতে দরিদ্র কৃষকদের ছেলেদের অর্থ দিয়ে নিজেদের পরিবর্তে সেনাবাহিনীতে পাঠাতো। 

[সূত্র: My Life: A Spoken Autobiography, Fidel Castro]

বর্তমানেও মার্কিনীরা এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলো একই কাজ করে। মধ্যপ্রাচ্য, আফগানিস্তান কিংবা পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলগুলোতে তাদের যত সৈন্য কর্মরত আর মারা গেছে তাদের প্রায় সবাই ছিল দরিদ্র পরিবারের সন্তান। এই সংক্রান্ত অসংখ্য পরিসংখ্যান পাওয়া যায় ড. তারেক শামসুর রেহমান এর বইগুলোতে। এমনকি তাদের আহত সৈন্যদের সরকারি কোনো সাহায্য দেয়া হয় না, যাদের তিনি ভিক্ষা করতে দেখে এসেছিলেন।


"১৯৭১ সালে, নিক্সনের সময় সোয়াইন ফ্লু ফিভারের ভাইরাস প্রথমবারের মতো একটা কন্টেইনারে করে কিউবায় চালান করা হয়, সিআইএর সূত্রে পাওয়া তথ্য। আমাদের প্রায় ৫ লাখ শুকর নিধন করতে হয়েছে। আফ্রিকায় উদ্ভূত এই ভাইরাস তখনও পর্যন্ত কিউবানদের কাছে অপরিচিত। এবং এটা দু'দুবার কিউবায় ছাড়ে তারা। এর থেকেও খারাপ দৃষ্টান্ত আছে। টাইপ টু ডেঙ্গু ভাইরাস, যেটা প্রায়ই মানবদেহে মরণাত্মক রক্তক্ষরণ সৃষ্টি করে এবং আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু ঘটায়। এটি ১৯৮১ সালের ঘটনা এবং সেবার ৩,৫০,০০০ কিউবান এতে সংক্রমিত হয়। সর্বমোট ১৫৮ জন মারা যায়, যার মধ্যে ১০১ জন শিশু। এই ভাইরাসের সেরোটাইপ তখনও গোটা বিশ্বের কাছে অপরিচিত এবং এটি একটি বিশেষ ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা। ১৯৮৪ সালে ফ্লোরিডা ভিত্তিক ওমেগা-থ্রি নামের একটি উগ্রপন্থি সংগঠন এর দায় স্বীকার করে জানায় যে, কিউবায় এই মরণ ভাইরাস তারা ছড়িয়েছে, যত বেশি সম্ভব মানুষের প্রাণহানি করা যায় সেটিই তাদের লক্ষ্য ছিল। আর ব্যক্তিগতভাবে আমার উপর হামলার ঘটনাগুলো তো না বললেই নয়।.....

আমি ভাইরাস রপ্তানীর কথা বলেছি, সোয়াইন ফিভার এবং হেমোরেজিক ডেঙ্গুর কথা বলেছি, যার দ্বারা আক্রান্ত হয়ে বহু শিশু মারা গেছে। আশির দশকে আমাদের কৃষিক্ষেত্রও জৈবিক হামলার লক্ষ্যে পরিণত হলো। উদাহরণস্বরূপ: ব্লু মোল্ড নামের একটি কীটনাশক দিয়ে আমাদের তামাকের ফলন নষ্ট করা হলো। এরপর আক্রমণ এলো আখের উপর। আমাদের উৎকৃষ্টতম আখ বীজ বারবাডোজ ৪৩৬২ নষ্ট করতে বিশেষ ধরনের মিকচার পাঠায় তারা। ৯০ শতাংশ ফসল নষ্ট হয়েছিল। এমন ঘটনা আমাদের ইতিহাসে নজীরবিহীন। কফি, তরমুজ, আলুসহ অন্যান্য ফসলেও বিস্তৃত হলো তাদের জৈবিক প্রতিহিংসা। প্রমাণ না থাকায় অভিযোগ তোলা কঠিন, কিন্তু বোঝা যাচ্ছিলো একের পর এক এমন আক্রমণকে কাকতালীয় বলে মেনে নেয়া আরো কঠিন। এবং লক্ষণ থেকে একসময় স্পষ্ট হতে থাকলো যে, এর পেছনে বিদ্বেষপ্রসূত ইন্ধন না থেকে পারে না। সবচেয়ে খারাপ দিক যেটি তা হলো, এ ধরনের আক্রমণের মোকাবিলা করতে হলে আপনাকে বিজ্ঞানের কাছে যেতে হবে। সামরিক সমাধানের প্রশ্ন এক্ষেত্রে অবান্তর।"

- 'My Life: A Spoken Autobiography', Fidel Castro


১৯৪৫ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি জার্মানির ড্রেসডেন শহরে মিত্র বাহিনীর (মূলত পশ্চিমারা) বোমা হামলা শুরু হয়। ‘অপারেশন থান্ডারক্ল্যাপ’ নামের এ অভিযানে নিহত হয়েছিল এক লাখ ৩৫ হাজার মানুষ।

https://en.m.wikipedia.org/wiki/Thunderclap_plan

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন শেষের দিকে তখন কথিত মিত্র বাহিনী এ হামলা চালায়। ব্রিটেন ড্রেসডেন শহরের ওপর হামলায় ৮৭৩টি ভারী বোমারু বিমান ব্যবহার করেছিল। কিন্তু ব্রিটিশ বিমানগুলো শহরের সাদা তেলের ট্যাংকগুলোর ওপর হামলা চালায়নি। কারণ ট্যাংকগুলো ছিল ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রিত শেল কোম্পানির মালিকানাধীন। 

https://en.m.wikipedia.org/wiki/Shell_plc

ব্যাপক বোমা হামলার পরও ট্যাংকগুলো এজন্য পুরোপুরি অক্ষত থাকে।




আধুনিক গেরিলা যুদ্ধের জনক করিম আল-খাত্তাবি ছিলেন এই সম্প্রদায়ের। যার রণকৌশল অনুপ্রাণিত করেছিল মাও সে তুং, হো চি মিন এবং চে গুয়েভারাকে। পশ্চিমারা এদের 'Berbers', অর্থাৎ 'বর্বর' বলে সম্বোধন করে! শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ 'বার্বারোস' থেকে, যার অর্থ বর্বর। পরবর্তীতে রোমান এবং আরবরাও শব্দটা ব্যবহার করে। লিবিয়া, আলজেরিয়া, মরক্কোসহ বিভিন্ন দেশে প্রাচীন গুহায় আঁকা চিত্রকর্ম থেকে বোঝা যায়, এসব অঞ্চলে আমাজিঘদের বসবাস অন্তত ১০-১২ হাজার বছর ধরে। লিখিত আকারে তাদের সম্পর্কে প্রথম বিবরণ পাওয়া যায় প্রায় ৩,৩০০ বছর আগের মিশরীয় লিপিতে। খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ শতকের দিকে লিবিয়ান আমাজিঘ গোত্র মেশওয়েশের সদস্যরা মিশরে গিয়ে বসবাস করতে শুরু করে। খ্রিস্টপূর্ব নবম শতাব্দীতে এই মেশওয়েশ গোত্রের আমাজিঘ রাজা প্রথম শোশেঙ্ক মিশরের ফারাও হিসেবে দ্বাবিংশতম রাজবংশের সূচনা করে। মুসলমানদের বাইরে প্রচুর আমাজিঘ ইহুদি ছিল আফ্রিকাতে, যারা ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠার পর সেখানে পাড়ি জমায়। ১৮৩০ সালে ফরাসিরা যখন আলজেরিয়া আক্রমণ করে, তখন স্থানীয় ক্যাবায়ল আমাজিঘরা তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কয়েক মাসের মধ্যে আলজিয়ার্সের পতন ঘটলেও ক্যাবায়লিয়া পার্বত্য অঞ্চল দখল করতে ফরাসিদের সময় লেগে যায় দীর্ঘ ৩০ বছর। ফরাসিরা আলজেরিয়াতে ডিভাইড অ্যান্ড রুল নীতি প্রচলনের লক্ষ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ আরবদের তুলনায় আমাজিঘদের বেশি সুযোগ-সুবিধা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু আমাজিঘরা তা প্রত্যাখ্যান করে লড়াই চালিয়ে যায় এবং আলজেরিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মরক্কোতে ফরাসি এবং স্প্যানিশ ঔপনিবেশের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রিফ অঞ্চলের আমাজিঘ গোত্রগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। স্বাধীনতার জন্য আমাজিঘদের এই আত্মত্যাগের মূল্যায়ন আলজেরিয়া এবং মরক্কোর আরব শাসকগোষ্ঠী করেনি। ডিকলোনাইজেশনের অংশ হিসেবে সর্বক্ষেত্রে ফরাসি ভাষাকে অপসারণ করে তারা আরবি প্রচলন করতে গিয়ে দেশগুলোর রাষ্ট্রভাষা হিসেবে কেবলমাত্র আরবিকে স্বীকৃতি দেয়। আড়ালে চলে যায় আমাজিঘদের মাতৃভাষা। আরব জাতীয়তাবাদ এবং জাতীয় ঐক্যের নামে তারা দেশের ভেতরে বিভিন্ন জাতির মধ্যকার বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করে দেশগুলোকে কেবল আরব পরিচয়ে পরিচিত করানোর চেষ্টা করে। তিউনিসিয়া, লিবিয়া, মিশরসহ অন্যান্য রাষ্ট্রেও আরব জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ স্বৈরশাসকরা আমাজিঘদের ভাষা, সাহিত্য এবং সংস্কৃতিকে জোরপূর্বক দমন করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আমাজিঘ ভাষা চর্চার কোনো সুযোগ না রেখে তাদের বাধ্য করা হয় আরবিতে পড়াশোনা করতে। লিবিয়া, মরক্কোসহ বিভিন্ন দেশে শিশুদের আমাজিঘ নামও রেজিস্ট্রেশন করতে দেয়া হতো না। প্রকাশ্যে কোথাও আমাজিঘ লিপি প্রচার করতে দেয়া হতো না।


স্তালিনের 'বর্বর' লাল ফৌজ যখন রাফায়েলের শিল্পগুলো রক্ষা করেছিল, তখন চার্চিলের 'সভ্য' ব্রিটিশ বাহিনী জার্মানির শিল্পকলা কেন্দ্র ড্রেসডেনকে বোমা মেরে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দুই কোটি ষাট লাখ লাল ফৌজের সৈন্য মারা গিয়েছিল, আর মিত্র বাহিনীর বাকি দেশগুলো থেকে দশ লক্ষ সৈন্য মারা গিয়েছিল। পঞ্চাশ হাজারের বেশি সোভিয়েত নাগরিককে যুদ্ধবন্দী হিসেবে জার্মানিতে নিয়ে যায় অক্ষশক্তি। কেবল সোভিয়েতের মূল ভূখণ্ডের মধ্যে অক্ষশক্তি কর্তৃক আটককৃত ৫৩ লক্ষ সোভিয়েতবাসীর মধ্যে পরে মাত্র ১০ লক্ষ লোককে জীবিত পাওয়া গেছে। অক্ষশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের এক হাজারের বেশি শহর, ৭০ হাজার গ্রাম, ৩২ হাজার শিল্প সংস্থা, ৯৮ হাজার যৌথ ও রাষ্ট্রীয় খামার ধ্বংস করে দিয়েছিল। যুদ্ধের শেষে মার্কিনিরা সোভিয়েত ইউনিয়নকে ৬০০ কোটি ডলারের সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিলেও একটা পয়সা পর্যন্ত দেয়নি এই বেঈমানরা। সোভিয়েত লাল ফৌজের আক্রমণে মাঞ্চুরিয়া থেকে জাপানিরা বিতাড়িত হলে জাপানের পার্লামেন্টে স্বীকার করা হয়েছিল লাল ফৌজ এতো দ্রুত অগ্রসর হচ্ছিল যে, শীঘ্রই জাপানের আত্মসমর্থন করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। বিশ্ব পর্যায়ে নিজেদের আধিপত্য কমে যাওয়ার ভয়ে এজন্য লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনের পরোয়া না করে মার্কিনিরা জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে আক্রমণ করে। 


হাতে স্বস্তিকা চিহ্ন আর সঙ্গে মুর বাহিনী নিয়ে স্পেনের লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করতে ফ্রাঙ্কো মাদ্রিদ শহরে পৌঁছেই লিরিয়া প্রাসাদ দখল করেছিল। যুদ্ধ লাগার পর আলবার ডিউক সস্ত্রীক সমস্ত মূল্যবান সম্পত্তি নিয়ে ইংল্যান্ডে পালিয়ে যায়। ঠিক একইভাবে কনফুসিয়াসের শেষ উত্তরাধিকারী মন্দিরের দক্ষিণা আর কনফুসিয়াসের হাড় বিক্রি করে প্রচুর মুনাফা লুটেছিল বিপ্লবের পর কনফুসিয়াসের প্রাসাদ ছেড়ে তাইওয়ানে পালিয়ে যাওয়ার আগে। যাওয়ার সময় অমূল্য চিত্রাবলী, চীনামাটির কারুকার্যখচিত নানা আসবাব, কনফুসিয়াসের কিছু অস্থি সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল। ঐখানেও সে দর্শনী বাবদ অর্থ আদায় করতো। ফ্রাঙ্কো মুর সৈন্যদের নিয়ে মাদ্রিদ দখলের পর সারা পৃথিবীর উদ্দেশ্যে বেতার মারফত এই মিথ্যা ঘোষণাটি প্রচারিত হয়েছিল-

"আলবার ডিউকের ঐতিহাসিক প্রাসাদ কমিউনিস্টরা লুট করেছে, আমরা সেই অমূল্য সম্পদ বাঁচাতে এগিয়ে চলেছি।"

বর্তমানে এই প্রাসাদের দেয়ালগুলো প্রায় ফাঁকা, কারণ ডিউক পালানোর সময় অমূল্য সব চিত্র নিয়ে গেছে। কেবল রেখে গেছে ঘর ভর্তি নানা ধরনের হাজার হাজার জুতা। এসব জুতা তথাকথিত 'সভ্যতা ও সংস্কৃতির ঐতিহাসিক নিদর্শন' বিধায় দর্শনার্থীদের স্পর্শ করা বারণ! অথচ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে জীবন দেয়া হাজার হাজার নগ্নপদ দরিদ্র স্পেনবাসীর লাশ এখনো তাদের মাটির নিচে ও পর্বতগুলোর তুষারস্তূপে লুকিয়ে আছে। ডিউকপত্নীর স্নানঘরে আছে বিরাট একটি রাজহাঁসের মূর্তি শোভিত বাথটাব। জার্মানরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রাসাদটির উপর চারটি আগুন বোমা ফেলেছিল।


এটা সিরিয়ার রুট যেটা দিয়ে ইজরায়েল হামলা করছে। ঐ দেশের আহাম্মক জনগণ, জঙ্গি এবং বামেরাআসাদকে সরিয়ে যাকে এনেছে সে দিচ্ছে এই রুট। ঐ পশ্চিমা দালাল গদিতে বসার পর সেক্যুলার দেশটিতে শরিয়া শাসন জারি করেছে। আসাদকে সরাতে এর আগে পশ্চিমা মিডিয়া গুজবের বন্যা বইয়ে দিয়েছিল, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট চেকার সাইটগুলো ভুল প্রমাণিত করে।






কিভাবে শুধু ফিকশন অর্থাৎ কাল্পনিক গল্প দিয়ে সোভিয়েত বিরোধী প্রোপাগান্ডা চালাতো পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীরা তার অন্যতম উৎকৃষ্ট উদাহরণ নিচের বইটা। এই নাটকটি অস্ট্রিয়ার এক সমকামী গোয়েন্দা কর্মকর্তার জীবন নিয়ে রচিত। সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা তার সমকামিতাকে দুর্বলতা হিসেবে ব্যবহার করে নিজের দেশের বিরুদ্ধে নাকি বিশ্বাসঘাতকতা করতে বাধ্য করে!


"ভিলেট হচ্ছে বিখ্যাত ও সবচেয়ে ভীতিকর মানসিক হাসপাতাল যেটা স্বাধীনতার বছর ১৯৯১ এ প্রতিষ্ঠিত। সে সময় ধারণা করা হচ্ছিল যে পুরাতন যুগোশ্লাভিয়া খুব শান্তিপূর্ণভাবে ভেঙ্গে যাবে (স্লোভেনিয়া মাত্র এগারো দিনের যুদ্ধে পৃথক হয়ে গিয়েছিল)। সে সময় একদল ইউরোপিয়ান ব্যবসায়ী সৈন্যদের পুরাতন ব্যারাকে একটি মানসিক হাসপাতাল তৈরির অনুমোদন পেয়েছিল। ব্যারাকটি রক্ষণাবেক্ষণের অতিব্যয়ের কারণে পরিত্যক্ত হয়েছিল। তার কিছু দিনের মধ্যেই যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে; প্রথমে ক্রোয়েশিয়ায়, তারপর বসনিয়ায়। যুদ্ধের কারণে হাসপাতালের অংশীদাররা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। কেননা পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে পুঁজিবাদীরা বিনিয়োগ করেছে যাদের অনেককে তারা চেনেনও না। সে ক্রান্তিকালে তাদের সাথে বসে প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে বোঝানোর এবং ধৈর্য ধারণ করার অনুরোধ জানানোর কোন অবস্থা ছিল না। তারা এ সমস্যার সমাধান করেছিল এমন কিছু ব্যবস্থার মাধ্যমে যা একটি মানসিক হাসপাতালের জন্য এবং একটা অনুকূল সমাজতন্ত্র থেকে উদ্ভূত নতুন জাতির জন্য খুব প্রশংসনীয় ছিল না। ভিলেট পুঁজিবাদের সকল বাজে বৈশিষ্ট্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। এ হাসপাতালে কাউকে ভর্তি হতে হলে সবচেয়ে বেশি যেটা প্রয়োজন সেটা হচ্ছে টাকা। এখানে এমন লোকের অভাব নেই যারা হয়তো উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত পরিবারের কলহপ্রিয় সদস্য থেকে (অথবা ঐ সদস্য সৃষ্ট বিব্রতকর কর্মকাণ্ড থেকে) মুক্তি পেতে চায়, অথবা কেউ হয়তো তাদের সমস্যাগ্রস্ত পিতা-মাতা বা সন্তানের জন্য বহুমূল্য দিয়ে একটা সার্টিফিকেট কিনতে চায়। আরো অনেকে আছে যারা বড় পরিমাণ দেনা থেকে রক্ষা পেতে কিংবা বিচারের আওতায় আসতে পারে এমন আচরণ থেকে রক্ষা পেতে কিছু দিন এই মানসিক হাসপাতালে কাটিয়ে যায় এবং পরবর্তীতে ঐ দেনা ও আইনগত প্রক্রিয়া থেকে মুক্তি পেয়ে যায়। ভিলেট এমন একটা জায়গা যেখান থেকে কেউ কখনো পালায়নি। এখানে আদালত থেকে অথবা অন্য হাসপাতাল থেকে মানসিক রোগীদের পাঠানো হয়। এ লোকগুলো, যারা পাগলামির অভিযোগে অভিযুক্ত বা পাগলামির ধরন রয়েছে এমন আরো কিছু লোকজনদের সাথে এখানে থাকে। ফলাফল একদম বিভ্রান্তিকর, এবং বিভিন্ন পত্রিকা ক্রমাগত এর বাজে সেবা ও অনিয়মের গল্প প্রকাশ করছে; যদিও তারা ভিলেট-এর ভেতরে পরিদর্শনের অনুমতি কখনো পায়নি এবং জানেও না ভেতরে আসলে কী হচ্ছে। সরকার অবশ্য অভিযোগগুলো তদন্ত করে দেখে, কিন্তু কখনোই অভিযোগের পক্ষে কোন প্রমাণ পায় না। বিনিয়োগকারীরা স্লোভেনিয়ায় বিদেশী বিনিয়োগ করা কঠিন এমন একটা গুজব বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি সব সময়ই দিয়ে থাকে। আর তাই প্রতিষ্ঠানটি একই ভাবে চলছে; সত্যি কথা বলতে আরো শক্তিশালী হচ্ছে।"

- 'Veronika Decides to Die', Paulo Coelho

...........................................................................................

দিদেরো বলতেন-

"ঈশ্বর ভক্তি আর রাজার অত্যাচার - দুয়ের মধ্যে সম্পর্ক আছে। পুরোহিতেরা যে রাজভক্তি প্রচার করে তারই দরুন সাধারণ মানুষ মুখ বুজে অত্যাচার সহ্য করতে শেখে। অতএব পৃথিবীর শেষ পুরোহিতটির নাড়িভুঁড়ির দড়িতে পৃথিবীর শেষ রাজাটিকে ফাঁসি না দেওয়া পর্যন্ত মানুষের সত্যিই মুক্তি নেই।"

তিনি আরও বলতেন- 

"স্বর্গকে ধ্বংস না করলে মর্তের উদ্ধার নেই।"

দিদেরো একটি বিশ্বকোষ সম্পাদনা করবার কাজ শুরু করলেন। তাতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমস্ত বিষয়ই আলোচনা করে দেখানো হয় যে, এই মতটাই খাঁটি সত্য। বিশ্বকোষকে ইংরেজি ভাষায় বলে এনসাইক্লোপিডিয়া। আর তাই দিদেরোর দলটির নাম দেয়া হয় এনসাইক্লোপিডিস্টস্। তখনকার ফরাসী সরকার এই বিশ্বকোষের বিরুদ্ধে নানা আইন জারি করেছিল, নানানভাবে লাঞ্ছনা করেছিল দিদেরোকে, দমন করবার চেষ্টা করেছিল তাঁর বিশ্বকোষকে। কিন্তু তিনি সমস্ত রকম অত্যাচার আর নির্যাতন সত্ত্বেও চালিয়ে গিয়েছিলেন এই বিশ্বকোষের কাজ।


"আমেরিকার 'রেড ক্রসে'র কর্তারা গত যুদ্ধের সময় রক্ত মজুত রাখতে গিয়ে নিগ্রোদের রক্ত আর সাদা চামড়া মার্কিনদের রক্ত আলাদা করে মজুত রাখবার ব্যবস্থা করেন। কী রকম কুসংস্কার দেখো : সাদা চামড়া মার্কিনদের গায়ে নিগ্রোদের রক্ত চালান করলে বুঝি তাদের রং যাবে! এ প্রায় সেকেলে সেই ডাক্তারদের কথা, যাঁরা মনে করতেন ভেড়ার গায়ে কুকুরের রক্ত চালান করে দিলে ভেড়াটা বদলে বেবাক কুকুর হয়ে যাবে!"

- 'পায়ের নখ থেকে মাথার চুল', দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়


'চিন্তা-যুদ্ধ' এর তাত্ত্বিক রূপকার জন ফস্টার ডালেস এর তত্ত্বের মূল বক্তব্য ছিল-

বস্তুবাদী ও যুক্তিবাদী দর্শনকে ঠেকাতে না পারলে শোষিত মানুষদের সম্মিলিত সংগ্রামকে ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। এবং শোষিত মানুষের জয় মানেই বর্তমান শোষণ প্রক্রিয়ার পরাজয়। শোষিত মানুষকে শোষণ করা যায়, কারণ তাদের চেতনার স্তর শাসক ও পুঁজিবাদী শক্তির ধারক-বাহকদের তুলনায় বহু যোজন পিছিয়ে পড়া। ততদিনই নিশ্চিন্তে শোষণ করা সম্ভব, যতদিন বঞ্চিত মানুষরা তাদের বঞ্চনার কারণ হিসেবে অদৃষ্ট, ঈশ্বর ইত্যাদিকে চিহ্নিত করবে; দায়ী করবে না পুঁজিবাদকে। শোষিতদের সংগ্রামী করে যে চেতনা, সেই জনচেতনার উন্মেষকে প্রতিহত করতে নিশ্চয়ই সেনা-পুলিশ-অস্ত্র ইত্যাদি প্রয়োগ করা যেতে পারে। কিন্তু তার চেয়েও কার্যকর অস্ত্র হিসেবে প্রয়োগ করা যেতে পারে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকে। 

ডালেস পথনির্দেশ দিলেন-

"আমাদের কর্তব্য হলো অঞ্চলভেদে বস্তুবাদ, নাস্তিক্যবাদ বিরোধী ধর্মীয় বিশ্বাসগুলোকে বাড়িয়ে তোলা।"

https://en.m.wikipedia.org/wiki/John_Foster_Dulles

পৃথিবীর ৮-৯ টি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি আছে, যাদের বার্ষিক আয় ভারতের মোট জাতীয় আয়ের প্রায় সমান, যে জাতীয় আয়ের মধ্যে টাটা-বিড়লা-আম্বানির মত ব্যবসায়ীদের বার্ষিক আয়ও রয়েছে। বিশ্বের ২০০টি বৃহৎ কর্পোরেট সংস্থার মোট আয় দুনিয়ার ৮০ শতাংশ মানুষের আয়ের চেয়েও বেশি। এই রিপোর্ট জাতিসংঘ দিয়েছিল। মুক্ত বাণিজ্য এলাকা গড়ে তুলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো 'নর্থ আমেরিকান ফ্রি ট্রেড অ্যাসোসিয়েশন' নামে। এরপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকো থেকে যত শিল্পদ্রব্য আমদানি করেছে, রপ্তানি করেছে অনেক কম। মেক্সিকান অর্থনীতির শীর্ষে রয়েছে মার্কিন মালিকানাধীন বহুজাতিক সংস্থা। অর্থাৎ, মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি মেক্সিকো শাখাতে মাল উৎপাদন করে পাঠায় তাদের মার্কিন শাখায়। আমেরিকা, জার্মানি, ব্রিটেন, ফ্রান্স সর্বত্রই বহুজাতিক সংস্থাগুলো কম খরচে উৎপাদন করে মুনাফা বাড়াতে কাঁচামাল সমৃদ্ধ ও শস্তা শ্রমের দেশগুলোতে পুঁজি বিনিয়োগ স্থানান্তরিত করছে। বহুজাতিক সংস্থাগুলো স্বদেশবাসীদের কর্মসংস্থানের বদলে বিদেশে পুঁজি নিয়োগ করে মুনাফা বাড়াতে উৎসাহী। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এক তৃতীয়াংশ হলো একই বহুজাতিক সংস্থার বিভিন্ন শাখার মধ্যে বাণিজ্য। আর এক তৃতীয়াংশ হলো বহুজাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে পারস্পরিক লেনদেন। ফলে রাষ্ট্রের বাণিজ্যিক উদ্বৃত্ত ও ঘাটতির পুঁথিগত ধারণা ও সংজ্ঞা গেছে বদলে। বহুজাতিক সংস্থার দাপটে অর্থনীতিতে ও সমাজ সংস্থানে রাষ্ট্রের ভূমিকা সীমিত ও নগণ্য হয়ে গেছে।

Comments

Popular posts from this blog

চাড্ডিগণ [এক]

মুস্তারেবিন

পাকিস্তান ও ইজরায়েল