মাই ইয়ার্স ইন এন ইন্ডিয়ান প্রিজন [পর্ব-এক]

 

বিহারের হাজারিবাগ সেন্ট্রাল জেলে আমার সেলের ভিতরে নিয়ে আসা একটা টেবিলের উপর আমি বসে আছি। ১৯৭০-এর জুন। ছ-সাত জন সাদা পোশাকের পুলিশ আমার মুখোমুখি। তাদের কেউ কেউ ঝুঁকে পড়ে, একেবারে আমার মুখের সামনে মুখ এনে, নাছোড়বান্দার মতো ক্রমাগত একই অভিযোগ করে চলেছে। অন্যদের গা ছাড়া ভাব, যেন রিল্যাকসড্, শিকার ধরা পড়ায় পরিতৃপ্ত। কিন্তু তাদের শীতল চাউনি আমার উপর স্থির নিবদ্ধ। বয়সে সবচেয়ে ছোটোজন আমায় জেরা করছে। তার ছোটো ছোটো চোখ দু'টি লাল, সশব্দ শ্বাস নির্গত হচ্ছে ঘনঘন; নিত্যদিন জেরায় অভ্যস্ত কঠিন, ভাবলেশহীন মুখ।

"আপনি চাইনিজ?"

"না, ব্রিটিশ।"

"আমি বলছি আপনি চাইনিজ। পাসপোর্ট কোথায়?"

"কলকাতায়।"

"মিথ্যে কথা। আপনার পাসপোর্ট আমার কাছে। দেখতে চান?"

কলকাতায় আমার শ্বশুরবাড়ি থেকে ওরা আমার জিনিসপত্র, টাকা-পয়সার সঙ্গে পাসপোর্টটাও বাজেয়াপ্ত করেছে। এদেশে আসার পথে যে যে দেশ আমি ঘুরে এসেছি, পাসপোর্টে সেসব দেশের স্ট্যাম্প ওদের বিভ্রান্ত করেছে।

"আপনি কি চীনে ছিলেন?"

"না।"

"আফ্রিকা?"

"না।"

দিন দুই পর ভারত আর ব্রিটেনের প্রেস খবর করলো যে আমি চীন, জাপান আর আফ্রিকার কয়েকটি দেশে গিয়েছি। ওদের বিশেষ অস্বস্তির কারণ ছিল পাসপোর্টে পাকিস্তান আর নেপাল - এই দু'টো দেশের স্ট্যাম্প।

"আপনি চীন থেকে অস্ত্র স্মাগল করতেন?"

"এদেশে বিপ্লব অর্গানাইজ করার জন্য আপনাকে পাঠানো হয়েছে।"

একজন তথাকথিত জাতীয়তাবাদীর পর্যবেক্ষণ আরও গভীর:

"ব্রিটিশরাজ থেকে আমরা মুক্তি পেয়েছি। আপনি আবার আমাদের পরাধীন করতে চান।"

আমি আমার সমস্ত কথা বিস্তারিতভাবে অসংখ্যবার বলেছি। আমার বাবার নাম, আমার ঠিকানা, কোথায় চাকরি করি, ছ'মাস আগে ইংল্যান্ড ছাড়ার পর থেকে আমার পুঙ্খানুপুঙ্খ ভ্রমণপঞ্জি, এমনকী যেখানে যেখানে ছিলাম সেসব হোটেলের নাম - সমস্ত কিছু বলা হয়ে গেছে। এবার রাজনৈতিক প্রশ্ন।

"চীন সম্পর্কে আপনার ধারণা কী?"

"চীনকে আমি শ্রদ্ধা করি।"

"চীন আমাদের শত্রু। উত্তর ভিয়েতনামকে আপনি সমর্থন করেন?"

"ভিয়েতনামে কী হবে না হবে, সেটা ঠিক করার অধিকারী শুধু ভিয়েতনামীরাই। বিদেশি হস্তক্ষেপের কী দরকার?"

"আর উত্তর কোরিয়া?"

"ও দেশের ব্যাপারে আমি খুব কম জানি।"

ওরা প্রেসকে বললো, আমি মাওবাদী, এক ভয়ংকর কমিউনিস্ট বিপ্লবী।

"অমলেন্দুর কী ধরনের বন্দুক ছিল?"

"অমলেন্দুর কোনো বন্দুক ছিল না।"

"আবার মিথ্যে বলছেন। ওকে ফাঁসিতে ঝোলানোর মতো যথেষ্ট প্রমাণ আছে আমাদের কাছে।"

"সত্যি কথা বলার জন্য পেটে মোচড় দিতে হবে দেখছি।" এক পুলিশের মন্তব্য। 

"আমার স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে পারি কি? একজন লইয়ারের ব্যবস্থা করা দরকার।"

"আপনার আবার স্বামী কে? আপনি তো বিবাহিত নন।"

"আপনি সব নকশালপন্থীরই শয্যাসঙ্গিনী। আপনি ডিসগাস্টিং।"

এক ডিপ্লোম্যাটিক পুলিশ: 

"ওর আজেবাজে কথার জন্য মাপ চাইছি। নিশ্চয়ই স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে পারেন। শুধু একটা পিটিশন লিখে দিন।"

পরদিন কাগজে বেরোল, আমি আমার 'আনঅফিসিয়াল' স্বামীর সঙ্গে জেলে একত্রে থাকতে চেয়েছি। আসলে অমলেন্দুর সঙ্গে পাঁচ বছর বাদে ভারত ছাড়ার আগে পর্যন্ত আর দেখা হয়নি। আমার দেয়া তথ্যের তারা পরীক্ষা করে, কেবলই পরীক্ষা করে।

"ভারতে এলেন কেন?"

"এই দেশটাকে, মানুষজনকে দেখতে; শিখতে।"

"এখানে থেকে গেলেন কেন?"

ভারতে থেকে যাওয়ার কারণ কীভাবে এদের কাছে ব্যাখ্যা করবো আমি? যারা যুক্তির ধার ধারে না তারা কত যেন সেটা বুঝবে! ভারতে ছ'মাসের জন্য বেড়াতে আসবো বলে অনেকদিন থেকে প্ল্যান করছিলাম আর টাকা জমাচ্ছিলাম। শেষ পর্যন্ত ১৯৬৯-এর ডিসেম্বরে লন্ডনে অনুবাদকের চাকরিটা ছেড়ে দিলাম। আমরা থাকতাম এসেক্স-এ; আর কাছেই টিলবেরি বন্দরে বাবা কাজ করতেন। সেসময় দেশ-বিদেশ থেকে যাওয়া-আসা করা জাহাজে টিলবেরি বন্দর সদা কর্মব্যস্ত থাকতো। সেসব দেখতে দেখতে বড়ো হওয়া আমাকে বিদেশ আর বিদেশি মানুষজন ভীষণ আকর্ষণ করতো। তেরো-চোদ্দো বছর বয়স থেকেই আমি হাতখরচের পয়সা জমিয়ে গরমের ছুটিটা বিদেশে কাটাতে যেতাম। লন্ডন ও জার্মানির বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় যখন বিভিন্ন দেশের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় হলো তখন নানা বিষয়ে সচেতন হতে শুরু করলাম, জানতে পারলাম পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলো ব্রিটেনকে কী চোখে দেখে। ক্রমশ উপলব্ধি হলো যে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের গৌরবজনক ইতিহাস বিষয়ে স্কুলে যা সব পড়েছিলাম, সেটা বস্তুত গৌরব করার মতো কোনো বিষয় নয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের নেয়া রাজনৈতিক নীতিসমূহ যে ভারতের মতো দেশগুলোর বর্তমান দারিদ্রের অন্যতম কারণ, সে সম্পর্কেও সম্যক ধারণা তৈরি হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন। উত্তর লন্ডনের উইজডেন-এর একটা স্কুলে আমি দু'বছর পড়িয়েছিলাম। নানা দেশের ছেলেমেয়েরা সেখানে পড়তো। নানান দেশের নানান জাতির ছেলেমেয়েদের পড়াতে পড়াতে জাতি-সম্পর্কের বিষয়ে আমার আগ্রহ জন্মায়। আমি তখন ক্যাম্পেন এগেন্সট রেশিয়াল ডিসক্রিমিনেশন নামে একটা সংগঠনের কাজে আমার বাড়তি সময়টুকু ব্যয় করতে শুরু করি। মোটামুটি ঐরকম সময়ে এক গ্রীষ্মে জার্মানিতে ছুটি কাটিয়ে দেশে ফেরার পথে অমলেন্দু সেন-এর সঙ্গে আমার দেখা হয়। ও তখন জার্মানিতে ট্রেনি ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকরি করতো। ট্রেনে সাধারণ কথাবার্তা দিয়ে যে সম্পর্কের সূচনা, পরে তা গভীর বন্ধুত্বে পরিণত হয়। রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রশ্নে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি একই রকম হওয়াতে সেটা সম্ভব হয়েছিল। ১৯৬৭-র শেষদিকে অমলেন্দু পশ্চিমবঙ্গে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। দেশের কাজ করবার তাগিদে ইউরোপের স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনকে উপেক্ষা করার এই সাহসী সিদ্ধান্তকে আমি মনে মনে শ্রদ্ধা করেছিলাম। কলকাতা থেকে অমলেন্দু নিয়মিত চিঠি লিখতো। কিছুকাল পর ও আমাকে ভারতে আসার আমন্ত্রণ জানালো। লিখলো থাকার জায়গার জন্য চিন্তা না করতে, ওদের পরিবারেই আমি থাকতে পারি। এই সুযোগ কি কেউ হাতছাড়া করে? আমি ভীষণ খুশি হয়ে আমন্ত্রণ গ্রহণ করলাম এবং ছ'মাসের মধ্যে ভ্রমণের খরচ জমিয়ে ফেললাম। আমার বাবা-মায়ের সঙ্গে অমলেন্দুর একবার দেখা হয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও ভারতের মতো এতদূর একটা দেশে যাবো শুনে ওদের চিন্তার শেষ নেই। বিদায় নেয়ার সময় বাবা-মা'রা যেমন বলে থাকেন 'সাবধানে থেকো', সেরকম কিছু না বলে বাবা বললেন: 

"শোন মেরি, হয়তো নানা আতঙ্কজনক ঘটনা দেখবে, কিন্তু তাতে খুব বেশি প্রভাবিত হয়ো না, নির্লিপ্ত থাকার চেষ্টা করো।"

পিতৃ হৃদয়ের সহজাত প্রবৃত্তিবশে তার সম্ভবত মনে হয়েছিল, ভারতে যে দারিদ্র, দুঃখ ও অমানবিকতার মুখোমুখি আমি হবো তাতে হয়তো চিরদিনের জন্য আমি পালটে যাবো। তুরস্ক, ইরান, আফগানিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের ছ'সপ্তাহ ব্যাপী এক চিত্তাকর্ষক ভ্রমণযাত্রার শেষে দিল্লি পৌঁছোলাম। কলকাতার উদ্দেশে রওনা দিলাম ১৮ জানুয়ারি, ১৯৭০, কালকা মেলে। থার্ড ক্লাস কামরায় বসে ভাবছিলাম, ওফ্ দীর্ঘ দু'বছর বাদে অমলেন্দুর সঙ্গে দেখা হবে। আচ্ছা, ও কি আমার সঙ্গে দার্জিলিং আর শ্রীলঙ্কায় যেতে পারবে? তবে আমার ভাবনা মতো যে সবকিছু না-ও হতে পারে, তার একটা আভাস পেলাম ঐ ট্রেনে বসেই। আমাকে আসন খুঁজতে সাহায্য করেছিলেন এক অল্পবয়সি নৌসেনা। তিনি কিছুক্ষণ পর আমার কামরায় এলেন গল্প করতে। একথা সেকথায় বললেন যে, কলকাতা রীতিমতো গণ্ডগোলের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গোটা রাজ্যে শাসনব্যবস্থা প্রায় নেই। গ্রামে চাষিরা জমিদারদের ফসল লুঠ করছে আর শহরে যুযুধান রাজনৈতিক দলগুলোই আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ভার নিয়েছে। তিনি উপদেশ দিলেন, আমার কলকাতা বাস যতো সংক্ষিপ্ত হয়, ততোই মঙ্গল। উত্তরবঙ্গের নকশালবাড়িতে ১৯৬৭ সালের কৃষক অভ্যুত্থান ও নকশালবাড়ি আন্দোলনের কথা আমার ইতিপূর্বেই লন্ডনের কাগজে পড়া ছিল। পড়ে ভারতে বিপ্লবের সম্ভাবনায় খুবই উত্তেজনা বোধ করেছিলাম। মনে হয়েছিল ভারতের মতো বড়ো ও এত বিশাল জনসংখ্যার দেশে বিপ্লব হলে সারা দুনিয়ায় সেটা কী ব্যাপক প্রভাবই না ফেলবে। ট্রেনে তরুণ নেভি যখন কথা বলছিলেন, আমি কোনো মন্তব্য ছাড়াই চুপচাপ শুনছিলাম। অবশ্য উনার মতো আমার চিন্তা জমিদার ও তাদের ক্ষতি নিয়ে ছিল না। আমি ভাবছিলাম সেসব গরিব অসহায় চাষিদের কথা, যারা সর্বনাশের কোন কিনারায় পৌঁছলে তবে ফসল লুটের মতো চরম রাস্তা নেয়। ভারতের অবস্থা সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা থাকলেও কলকাতা এসে যা প্রত্যক্ষ করলাম তা দেখবো বলে একেবারেই তৈরি ছিলাম না। ট্যাক্সি নিয়ে স্টেশন থেকে শহরে যাওয়ার পথে দেখি প্রতিটি দেয়াল বিশাল বিশাল শ্লোগানে ভরতি: 

বন্দুকের নলই রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস। 

নকশালবাড়ি লাল সেলাম। 

চীনের পথ আমাদের পথ। 

পশ্চিমবঙ্গের জেলাগুলোতে সশস্ত্র সংগ্রাম কতটা অগ্রসর হয়েছে তা ম্যাপে এঁকে ঝোলানো রয়েছে ল্যাম্পপোস্টে। অমলেন্দুদের বাড়ি কলকাতার রিফিউজি প্রধান অঞ্চলে। ওরাও পূর্ব বাংলার লোক, দেশভাগের পর এখানে চলে আসে। প্রথম কিছুদিন কাটলো একটি বাঙালি পরিবারের ধরন-ধারণ বুঝতে। অসংখ্য আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবময় জীবন। তাদের সকলের সঙ্গে পরিচয় হলো। আর কতো বিচিত্র রান্না যে খাওয়া হলো। এসবের মধ্যেও কিন্তু আরেকটা ব্যাপারে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম - স্পেশাল ব্রাঞ্চের পুলিশ। ওরা থাকতো বাড়ির সামনে পুকুরের ধারে নারকেল গাছের তলায়, এলোমেলো ঘুরে বেড়াতো পাড়ার দোকানের আশেপাশে। আমার বইপত্রের মধ্যে পিকিংয়ে প্রকাশিত কোনো কিছু আছে কিনা, সে ব্যাপারে প্রথমেই অমলেন্দুর দাদা নিশ্চিত হয়েছিলেন। কেননা কিছুদিন আগেই কাছেই একটা বাড়ি থেকে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল চীনে প্রকাশিত বই রাখার অপরাধে। পরে অমলেন্দুর এক প্রতিবেশী আমায় বলেছিলেন, উনাদের পরিবারে বহুকাল ধরে রক্ষিত এক প্রাচীন তলোয়ার উনি জলের ট্যাঙ্কে লুকিয়ে রেখেছিলেন পুলিশের ভয়ে। জানুয়ারিতেই গরম পড়ে গেলো। দক্ষিণ ভারতে বেড়াতে যেতে হলে বেশি গরম পড়ার আগেই বেরিয়ে পড়া দরকার। ঠিক করলাম প্রথমে পুরী যাবো। আশা করেছিলাম অমলেন্দুও সঙ্গে যাবে। কিন্তু ও পারলো না। কাজেই কলকাতার যা কিছু দর্শনীয়, সেসব দেখে দুয়েক মাসের মধ্যেই ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে একাই পুরী এক্সপ্রেসে চেপে বসলাম। পুরী থেকে পরের দু' মাসে কতো জায়গা-ই না ঘুরলাম - মাদ্রাজ, শ্রীলঙ্কা, বোম্বে, কাঠমাণ্ডু, বেনারস। সমুদ্র সৈকত, মন্দির, ভাস্কর্য কতো কী দেখা হলো। তবে একটা কথা, বাসে বা গাড়িতে অন্য ট্যুরিস্টদের সঙ্গে ঘোরার সময় বুঝতে পারতাম আমরা একই দৃষ্টিতে ভারতবর্ষকে দেখছি না। বেনারসে আমার সহযাত্রী অন্য ট্যুরিস্টরা যখন মহারাজার প্রাসাদ অথবা কোনো মন্দির দেখে উচ্ছ্বসিত, আমি তখনও ভেবে যাচ্ছি সকালে গঙ্গার ঘাটে দেখা একটা নোটিশের কথা, যেখানে লেখা: 

ভিখারি, স্নানরত মানুষজন, কুষ্ঠরোগী, মৃতদেহ প্রভৃতির ফটো তোলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

আগ্রায় নিয়মমাফিক তাজমহলের ছবি তুললাম ঠিকই, কিন্তু মনে রয়ে গেলো সেই হতভাগ্য রিকশাওয়ালাটির মুখচ্ছবি যে দীর্ঘক্ষণ আমাকে অনুসরণ করেছিল এই আশায় যে, আমি ওর সওয়ারি হবো। পুরীতে বিখ্যাত জগন্নাথ মন্দিরের সামনে যখন দাঁড়ালাম, মন্দিরের চেয়েও বেশি অভিঘাত সৃষ্টি করলো মন্দিরের সামনে কুষ্ঠরোগীর দীর্ঘ সারি। ফুটপাথে নিতান্ত অবহেলায় পড়ে থাকা আসন্ন প্রসবা অথবা পূতি গন্ধময় নদর্মার পাশেই সসপ্যান ধুয়ে নেয়া এক মেয়ে অথবা কলকাতার কাদা ও খানাখন্দে ভরা রাজপথে খালি পায়ে রিকশা টেনে নিয়ে চলা হাড় জিরজিরে শীর্ণ, অর্ধনগ্ন এক মানুষ - এসব দৃশ্যের পাশে বড়োই অপ্রয়োজনীয় ও মূল্যহীন মনে হয় কোনো সুবিখ্যাত ট্যুরিস্ট স্পট। কেন ভারতবর্ষ আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারছে না, সেটা বোঝা খুব কঠিন নয়। আমার মনে হলো, কলকাতায় যা সব দেখেছি ও শুনেছি সেগুলো হতেই পারে ভয়ঙ্কর এক অগ্ন্যুৎপাতের প্রাথমিক বিকিরণ। যতো দিন যাচ্ছিলো নিজেকে আর ট্যুরিস্ট ভাবতে পারছিলাম না। আমার সমস্ত ভাবনা জুড়ে তখন অগণ্য ভিখারি, কুষ্ঠরোগী, গরিব, অসহায় নির্যাতিত মানুষগুলো। শেষ পর্যন্ত ভারতের প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতির কোনো মহৎ তাৎপর্য রইলো না আমার কাছে। কলকাতায় ফিরে শহরটাকে আরও টালমাটাল লাগলো। যুক্তফ্রন্ট সরকার পদত্যাগ করেছে, রাজ্যে রাষ্ট্রপতির শাসন। টাকা বদল করতে ব্যাঙ্কে গিয়ে শুনি কর্মচারীরা আলোচনা করছে গ্রামাঞ্চলে সশস্ত্র সংগ্রামের সঠিক রণনীতি কী হওয়া উচিত তাই নিয়ে। একদিন কফি হাউজে গিয়ে দেখি ছাত্র আর ইন্টেলেকচুয়ালদের ভিড়ে গমগম করছে। কানে এলো অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীকাকুলামে তিনশো গ্রাম মুক্তাঞ্চলে পরিণত হওয়ার উত্তেজিত আলোচনা। পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুরেও শিগগিরই আরও একটি মুক্তাঞ্চল গড়ে উঠবে বলে শোনা গেলো। খোদ কলকাতাতে সন্দেহভাজন নকশালদের ব্যাপক ধরপাকড় অব্যাহত। যেসব নকশালপন্থীদের সঙ্গে আমি কথা বলেছিলাম, মনে হলো একটা ব্যাপারে তারা সকলেই একমত। সেটা এই যে, ভারতবর্ষের সত্তর শতাংশ লোক গ্রামে প্রায় সামন্ততান্ত্রিক অবস্থার মধ্যে বাস করে। তাই গ্রামের সমাজ ও ভূমি সংস্কার সাধনই এই সংগ্রামের প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত। ফলত, শহরের শিক্ষিত যুবকরা কৃষি বিপ্লবের রাজনীতি প্রচার করতে ও কৃষক সংগ্রামে যোগ দিতে দলে দলে গ্রামে গিয়ে হাজির হলো। এক নতুন ভারতবর্ষ গড়ে তোলার তীব্র বাসনায় শহরে বড়ো হওয়া তরুণ যুবকরা বাড়িঘর, পড়াশোনা ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করে চাষির জীবনের কাঠিন্য ভাগ করে নিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি। আমার দেখা মানুষজনদের মধ্যে আমি লক্ষ করেছিলাম সংসদীয় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি বীতশ্রদ্ধ ভাব আর চলতি ব্যবস্থার আশু পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায় নকশালপন্থীদের প্রতি ব্যাপক সমর্থন। আমার ব্রিটেনে ফিরে যাওয়ার সময় এগিয়ে আসতে লাগলো। অমলেন্দু আর ওর বন্ধুদের সঙ্গে কথা হতো কীভাবে আমি ও আমার মতো ভারত অনুরাগীরা এই আন্দোলনের সাহায্যে আসতে পারি। একদিন ওর একজন বন্ধু বললো, "সত্যি যদি সাহায্য করতে চাও, তবে আমাদের সঙ্গে থেকে যাও না কেন?" কথাটা সে সিরিয়াসলিই বলেছিল, কিন্তু তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মনে হলো অবাস্তব প্রস্তাব। ইংল্যান্ডে আমার চাকরি আছে, আমার ফ্ল্যাট রয়েছে, আমার পরিবার সেখানে আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে। তবে সেইসঙ্গে এটাও মনে হলো যে, এখানে মানুষের অবর্ণনীয় দারিদ্র আর কষ্ট দেখে যেরকম বিচলিত হয়েছিলাম, তারপর যেন কিছুই হয়নি এমন ভাব করে লন্ডনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবনে ফিরে যাওয়ার মধ্যে এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতার ব্যাপার আছে। কিছুদিন চিন্তাভাবনার পর সাময়িকভাবে থেকে যাওয়াই মনস্থ করলাম, অন্তত যতদিন পর্যন্ত না ভারতের অবস্থা সম্পর্কে আমার ধ্যানধারণা কিছুটা উন্নত হয়। ইউরোপে কয়েক বছরের কাজের অভিজ্ঞতা থাকায় অমলেন্দু বিলাসবহুল জীবনযাপনের উপযোগী এক বিশাল মাইনের চাকরির অফার পেলো। বিলাসী জীবনের বদলে ও বেছে নিলো অত্যন্ত সাদাসিধা এক জীবন আর বেশিরভাগ সময়টাই কাটাতো সমাজের দরিদ্রতম মানুষজনদের সঙ্গে। বিদেশে বিলাস-বৈভবের বাড়াবাড়ি দেখে ও আরও বেশি করে নিজের দেশের মানুষের দুরবস্থার বিষয়ে সচেতন হয়ে ওঠে। ও সবসময় বলতো দেশবাসীর অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের পর্যাপ্ত সংস্থান না হওয়া পর্যন্ত ভারতের প্রকৃত স্বাধীনতা আসবে না। কয়েক সপ্তাহ কলকাতায় একসঙ্গে কাটানোর পর অমলেন্দু আমাকে ওর জীবনের অংশীদার হওয়ার আহ্বান জানালো। পরস্পরকে ভালো লাগার বন্ধনে আমরা ইতিমধ্যেই আবদ্ধ, সেটাকে আরও দৃঢ় করেছে ভারতের জনসাধারণ সম্পর্কে আমাদের দু'জনের একই মনোভাব। পরস্পরকে আমরা ভালোই চিনতাম, জানতাম, একই নীতি ও আদর্শের আমরা শরিক। তাছাড়া ওর পরিবারের সকলেই আমাকে পছন্দ করতো, প্রথম দিন থেকেই আমি ওদের পরিবারের একজন হয়ে গেছি। এসবই ঠিক আছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এরকম একটা বড় সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন ছিল। দ্বিধাদ্বন্দ্বে কাটলো কয়েকটা দিন। শেষ পর্যন্ত মনে হলো, দেশে ফিরে যাওয়া এবং সম্ভবত জীবনে আর কখনো অমলেন্দুর সঙ্গে দেখা না হওয়ার ভাবনাটা বড়োই কষ্টকর। অবশেষে একদিন জবাব দেয়ার শক্তি অর্জন করলাম। ১৯৭০-এর ১০ এপ্রিল হিন্দু রীতি অনুযায়ী খুব সাধারণভাবে আমাদের বিয়ে হলো। বিয়ের কয়েকদিন আগে সমস্ত ঘটনা ব্যাখ্যা করে জীবনের কঠিনতম চিঠিটা লিখেছিলাম বাবা-মাকে। আমার ফেরার পথ চেয়ে তারা বসেছিলেন। তার বদলে এই চিঠি। স্বভাবতই ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলেন তারা। কিন্তু মা আমাকে লিখেছিলেন, তাঁদের একমাত্র কাম্য আমাকে সুখী দেখা এবং আমি যা ঠিক মনে করবো তা-ই যেন করি। ভারতে যদি আমাকে থাকতেই হয়, আমার মনে হলো, তবে সবার আগে আমার জানা উচিত ভারতের গ্রামকে, বর্তমান আন্দোলনের যেটা কেন্দ্রবিন্দু। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ভারতের গ্রামাঞ্চলে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা, জমিদার ও মহাজনদের কাছে সারাজীবনের জন্য ঋণে নিমজ্জিত গরিব চাষি, ভূমিহীন কৃষক ও অন্যদিকে গ্রামে না থাকা জমি মালিকদের হাতে হাজার হাজার একর জমি - এসব পড়ে উপলব্ধি করলাম, আমার প্রচুর ঘুরে বেড়ানো সত্ত্বেও গ্রামীণ ভারত সম্পর্কে আমি কতো কম জানি। আমি প্রাসাদ ও বিজয়স্তম্ভ দেখেছি, শহর দেখেছি, শহরের বস্তিও দেখেছি; কিন্তু ভারতের গরিষ্ঠাংশ মানুষ যেখানে বাস করে সেই গ্রাম সম্পর্কে না জানলে আমি ভারতবর্ষ দেখেছি বলে দাবি করতে পারি না। গ্রামের বাস্তব অবস্থা নিজের চোখে দেখার ইচ্ছায় আমি অমলেন্দুকে রাজি করালাম আমায় কোনো গ্রামে নিয়ে যাওয়ার জন্য। মে মাসের শেষে আমরা কলকাতা ছাড়লাম। জামশেদপুরের কাছে বাংলা-বিহার সীমান্তে সিংভূম জেলার একটা গ্রাম থেকে আমি গ্রেপ্তার হই। সেখানে মাত্র দু'দিন ছিলাম। এক গরিব চাষির মাটির কুঁড়েঘরে আমরা ছিলাম। ওর সঙ্গে আমাদের বাসস্ট্যান্ডে যাওয়ার পথে রাস্তায় দেখা হয়েছিল। শরতের গ্রামগুলো এতো প্রত্যন্তে যে, সেখানে হোটেল বা গেস্ট হাউজ থাকার কোনো প্রশ্নই নেই। তবে গ্রামের মানুষজন স্বেচ্ছায় অচেনাকে আশ্রয় দেয়, যা খাবারদাবার আছে সেটাই ভাগ করে নেয়। গ্রামের বাসিন্দা মূলত আদিবাসী, নিজেদের জমিতে চাষ করে কোনোরকমে অন্ন সংস্থান করে। কিছুদিন আগে খরার কারণে কৃষি ও অকৃষি জমির ফারাক করা যায় না; সমস্তই শুষ্ক, ঊষর। গাছপালা বলতে আগাছা, ঝোপঝাড় আর পুদিনা। গ্রাম ঘিরে ছোটো ছোটো পাহাড়, টিলা। রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে কয়েক মাইল গেলেই পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর, যেখানে নকশালরা সমগোত্রীয় জনগণের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে কাজ করছে। সিংভূমেরও কিছু অংশে তাদের কাজের বিস্তার ঘটেছে। কিন্তু আমরা যে গ্রামে ছিলাম সেখানকার কেউই এ বিষয়ে কিছু শোনেনি। গ্রামে সবচেয়ে বেশি জমির অধিকারী যে, তাকে নাকি বলা হয়েছিল গ্রামে নতুন কেউ এলে যেন পুলিশে খবর দেয়া হয়। কাজেই আমরা কিছু না জানলেও আমাদের উপস্থিতি সম্পর্কে তারা ইতিমধ্যেই অবহিত ছিল। সেদিন ভোরে অমলেন্দু আর ওর ভাই জামশেদপুরের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছিল। ছ'মাইল হেঁটে বাজার, সেখানে জামশেদপুর যাওয়ার বাস পাবে। সেদিনই সন্ধ্যায় যেহেতু ওদের ফিরে আসার কথা, আমি তাই ওদের সঙ্গে না গিয়ে গ্রামেই থেকে গিয়েছিলাম। ঘরের সামনে দাওয়াতে একটা ছাউনির নীচে বসে আমি পেঁয়াজ দিয়ে পান্তা খাচ্ছিলাম। ছুরি, কাঁটাচামচ ছাড়া অনভ্যস্ত আমার শুধু হাতে খাওয়া ওদের চোখে একটু অদ্ভুত লাগতো। তাই আমি খেতে বসলেই মেয়েরা আর বাচ্চারা কৌতূহলী চোখে আমার খাওয়া দেখতো। সেদিন সকালেও ওরা আমার চারপাশে বসে আমার খাওয়া দেখছিল। পান্তা খেলে কেমন একটা ঝিমুনি ভাব আসে। পান্তা খেয়ে আমি খাটিয়ার উপর শুয়ে পড়লাম। হঠাৎ কেউ একজন আমায় ঝাঁকুনি দিয়ে জাগালো এবং ইশারায় দরজা দেখিয়ে তৎক্ষণাৎ গৃহত্যাগ করতে বললো। তখনও ঝিমুনি ভাব সম্পূর্ণ যায়নি, হতবুদ্ধির মতো দরজার বাইরে পা রাখতেই পাঁচজন সশস্ত্র পুলিশ আমায় ঘিরে ধরলো। তারপর দড়ি দিয়ে কোমর, হাত আর ঘাড় শক্ত করে বাঁধলো এবং ঠেলে ঠেলে নিয়ে চললো। বাঁধন এতই শক্ত যে নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। দড়ি আলগা করার জন্য ওদের বৃথাই ইঙ্গিত করলাম। গ্রামের বাইরে একটা গাছতলায় আমাকে বসানো হলো। ওরা অপেক্ষা করছিল ওদের অফিসারের জন্য। একটু পরেই দেখি লাল লাল পিঁপড়ে আমার পা বেয়ে নিতম্বের দিকে চলেছে। মাথার উপর জ্বলন্ত সূর্যের প্রখর রোদ। কিছুক্ষণ পরেই আমার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগলো। অত:পর আমায় দাঁড় করানো হলো, শুরু হলো তল্লাশি। আমার কাছে যা কিছু ছিল - হাতঘড়ি, টাকা, রুমাল আর চুলের ক্লিপ - সব নিয়ে নিলো। শরীর তল্লাশির সময় বুকে হাত দিতেই আমি ক্রুদ্ধ হয়ে শরীর ঝাঁকিয়ে ওদের হাত সরালাম এবং বুঝতে পারলাম, আমি যে মেয়ে সেটা ওরা তখনই বুঝলো। ছোটো করে ছাঁটা চুল অর ঢিলে পাজামার কারণে ওরা সেটা আগে বুঝতে পারেনি। আমি আবার বসে পড়লাম। আমার অবস্থা দেখে ওদের একজনের বোধহয় একটু দয়া হলো। বোতল খুলে পানি খেতে দিলো, একটা ন্যাকড়া ভিজিয়ে কপালে রাখলো। অবশেষে উদয় হলো এক ইংরেজি বলিয়ে উদ্ধত অফিসারের। শুরু হলো বোল্ডার ও পাথর বিছানো জঙ্গলের রুক্ষ পথে এক ঘণ্টা ব্যাপী হাঁটা। আমার পায়ে রবারের স্যান্ডেল। তাই পরে কী আর এই রাস্তায় হাঁটা যায়? পা কেটে রক্ত পড়তে লাগলো। রক্তাক্ত পা, হাত পিছমোড়া করে বাঁধা, কোনোমতে হাঁটছি। তার মধ্যে অফিসারের ঠ্যালা, আরও দ্রুত পদচারণার জন্য। গ্রাম ছাড়িয়ে যখন বেশ অনেকটা এসেছি, অফিসারের নির্দেশে দাঁড়াতে হলো। আমায় বললো সার্চ করবে। বললাম, একবার হয়ে গেছে। বললো, নগ্ন করে সার্চ করবে। বললাম, সেক্ষেত্রে ও চাকরি খোয়াতে পারে, কেননা আমি বিদেশি নাগরিক। কিছুটা মরিয়া হয়েই বলেছিলাম, কাজ হবে ভাবিনি। কিন্তু দেখলাম কাজ হলো। ক্যাম্পে পৌঁছে আমায় জিপে তোলা হলো। এবারের গন্তব্য বেশ কয়েক মাইল দূরের যদুগোড়া থানা। জিপে যেতে যেতে একটা কনস্টেবল বললো দু'দিন ধরে তার পেটে একটা দানাও পড়েনি। নকশালদের খোঁজে গোটা তল্লাট জুড়ে তারা চিরুনি তল্লাশি চালাচ্ছে, অথচ তাদের খাবারের কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। থানায় এসে ফটো তোলা হলো এবং শুরু হলো এক দীর্ঘ, অন্তহীন জেরা। ইউনিফর্ম ও সাদা পোশাকের পুলিশ অসংখ্যবার এসে এসে ক্রমাগত একই প্রশ্ন করে যাচ্ছে ও উত্তরগুলো নোটবইয়ে লিখে নিচ্ছে। এই সীমাহীন জেরায় বিধ্বস্ত আমি খাটিয়ায় বসে সামনের একটা ঘরের ভেজানো দরজার ফাঁক দিয়ে দেখতে পাচ্ছি মেঝেতে বসা ছোটো একটা ছেলে; তার হাতে হাতকড়া, কোমরে দড়ি, একটা চোখ ফোলা, থুতনি বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। পরনে শুধু হাফ প্যান্ট, জ্বরে কেঁপে কেঁপে উঠছে। সিজার লিস্ট পড়া শুরু হলো।

"অমলেন্দু সেন। চারশো টাকা।"

আমি চমকে উঠলাম। বুঝলাম ওরা অমলেন্দুকেও অ্যারেস্ট করেছে। পুলিশকে বললাম আমাকে এখান থেকে নিয়ে গিয়ে অমলেন্দুদের সঙ্গে রাখতে। ওরা গ্রাহ্যও করলো না। তবে সন্ধেবেলা হঠাৎ আমাকে ওদের ঘরে নিয়ে গেলো। দেখলাম, অমলেন্দু আর ওর ভাই সহ জনা পনেরো একসঙ্গে দড়িতে বাঁধা অবস্থায় মেঝেয় বসা। আমাদের খেতে দেয়া হলো। খাবার পর অমলেন্দু ও আরও কয়েকজনকে সেলে ঢুকিয়ে দিলো। আমরা বাকিরা রাতের মতো সে ঘরেই রয়ে গেলাম। ফোলা চোখের সেই ছেলেটি আবার জ্বরে কাঁপতে শুরু করলো। আমি যে কাপড়টা পেয়েছিলাম সেটা ওর গায়ে দিলাম। কিন্তু অনুকম্পা পাওয়াও পুলিশের চোখে অপরাধ। রক্তাক্ত ও জ্বরে কাবু ছেলেটিকে ওরা তাই রাইফেলের বাঁট দিয়ে মারলো। পরদিন সকালে আমাদের চাইবাসায় নিয়ে চললো। সারাদিন আমরা বদ্ধ পুলিশ ভ্যানে অভুক্ত বসে রইলাম। এমনকি পানিও জোটেনি। অল্প বয়সিরা কেউ কেউ গান গাইছিল। আমি আর অমলেন্দু কথা বলছিলাম। আমি অন্তত তাড়াতাড়ি ছাড়া পাবো, এ ব্যাপারে অমলেন্দু প্রায় নিশ্চিত। আমায় ঠাট্টার সুরে বললো, জেলে যেন ওর সঙ্গে দেখা করতে আসি। চাইবাসার জেলে তিনদিন ছিলাম। জেলারের নির্দেশে একজন মহিলা রক্ষী আমায় তল্লাশি করলো। তারপর জেনানা ওয়ার্ডে পাঠিয়ে দিলো। রাত্রে গাদাগাদি করে শুতাম, প্রস্রাবের গন্ধে বমি আসতো। সকালে পুরুষ রক্ষীর ডিউটি পড়তো। কোনো কোনো মেয়ে ওর সঙ্গে খুনশুটি করতো, বেল্ট খুলে নিতো, খেলাচ্ছলে চাবি লুকিয়ে রাখতো। আমার খুবই কাহিল দশা, ওদের কাণ্ডকারখানা দেখার ইচ্ছেও হতো না। অন্যরা তেল-সাবান দিয়ে আমায় গোসল করিয়ে দিতো, আমার ব্যথা পায়ে মালিশ করে দিতো।

কল্পনা, এক মধ্যবিত্ত পরিবারের বাঙালি মেয়ে, তৃতীয় দিন রাতে এলো। আমার একদিন পর ও ধরা পড়েছিল। অভিযোগ একই - নকশাল। কল্পনা খুব বিধ্বস্ত অবস্থায় ছিল, পুলিশি অত্যাচারের কথাই শুধু বলতো। ও দেখেছে পাঁচ জনকে ঝুলিয়ে পুলিশ মারছে। এরপরও 'কথা' না বললে মলদ্বারে রড ঢুকিয়ে দিতো। আঠারো জন পুরুষ বন্দির সঙ্গে একটা ছোট্ট সেলে ওকে রাখতো। শুধু জেরার সময় বের করতো।

চাইবাসাতেও পুলিশি জেরা জারি ছিল। অন্য বন্দিদের সঙ্গে আমার যে একটা সহজ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, ওরা যে আমায় কাপড় পড়তে দিয়েছিল, হাতে রঙিন কাচের চুড়ি পরিয়ে দিয়েছিল, সেসব জেলকর্তাদের পছন্দ হয়নি। ওদের ধারণা ছিল অন্য বন্দিদের সঙ্গে আমি কমিউনিকেট করতে পারবো না। ভাষা ও সংস্কৃতির পার্থক্য সত্ত্বেও যে মানুষে মানুষে সহমর্মিতার সম্পর্ক গড়ে ওঠা সম্ভব, এটা ওরা জানতো না। জেলার হঠাৎ আমার হাতের কাচের চুড়িগুলো ভেঙে দিলো, পাছে তার কর্তৃত্বে কেউ সন্দেহ করে। তারপর শাসানি - ওইসব 'চোর আর খুনিদের' সঙ্গে যেন না মিশি। ১৯৭০-এর পয়লা জুন, সোমবার, আমরা চাইবাসা থেকে বদলি হয়ে গেলাম। দু'ডজন সশস্ত্র প্রহরীর উপস্থিতিকে গুরুত্ব না দিয়ে আমি অমলেন্দুর পাশে বসে গল্প করতে করতে গিয়েছিলাম। অমলেন্দু বললো, আমরা ১৪২ মাইল দূরে হাজারিবাগ জেলে যাচ্ছি। নিবর্তনমূলক আটক আইনে আগেই ওখানে ছিল এমন একজন ওখানকার গল্প করছিল - কী খেতে দেয়, কীরকম কাপড় পরতে দেয় এইসব। তবে আমি বা অমলেন্দু কেউই সিরিয়াসলি ভাবিনি যে, আমাদের দীর্ঘদিন জেলে আটক রাখবে। বছর দুয়েক জেলবাসের পরই বুঝতে পারি, কী বোকাই না আমরা ছিলাম। হাজারিবাগ জেল অফিস ঘরের একপাশে ছেলেরা আর অন্য পাশে মেয়েরা দাঁড়িয়ে। আমি কল্পনার সঙ্গে মেয়েদের দিকে পা বাড়াতেই এক জেলকর্মী রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে আমাকে ছেলেদের দিকে যাওয়ার হুকুম করলো। এতে একটা হাসির রোল উঠলো আর জেলকর্মীটি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে পুনরায় আমার নামধাম জিজ্ঞেস করা শুরু করলো। যাই হোক, একটু পরে ওখান থেকে বিদায় নিতে হলো। অমলেন্দু আর ওর ভাই শুয়ে ছিল। টা-টা করার সময় অমলেন্দুর মাথায় একটু বিলি কেটে দিলাম, ওর ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে হাসলাম, তারপর রক্ষীর পিছন পিছন একটা বিশাল দরজার মধ্যে আরেকটা ছোট্ট দরজা দিয়ে আমি আর কল্পনা জেলের ভিতর ঢুকে গেলাম। তখন অন্ধকার হয়েছে। রক্ষীর হাতে লণ্ঠন। সে আলোয় দেখা গেলো বিশাল উঁচু পাঁচিলের গা দিয়ে পাথরের রাস্তা। আমরা খালি পায়ে হেঁটে এসে দাঁড়ালাম আর একটা দরজার সামনে। সেটা খোলা হলো, আমরা ঢুকলাম আর আমাদের পিছনে দরজাটা সশব্দে বন্ধ হয়ে গেলো।


Comments

Popular posts from this blog

চাড্ডিগণ [এক]

মুস্তারেবিন

পাকিস্তান ও ইজরায়েল