সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ে ক্যাস্ত্রোর স্বীকারোক্তি [পর্ব-দুই]

 



এসকল পত্রালাপ ইতিপূর্বে ছাপা হয়েছে। কিন্তু আমার মনে হয়েছে আপনার অনুরোধে অক্টোবর সংকটের উপর আজকের এই পূনরালোচনায় এগুলোর অন্তর্ভূক্তি গুরুত্ব যোগ করবে। কারণ আমি আগেই বলেছি এগুলোকে বাদ দিয়ে অক্টোবর সংকটের রাজনৈতিক, আবেগিক এবং সামরিক গুরুত্ব উপলব্ধ হবে না। 

১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বরে মস্কো সফরের সময় সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভের সাথে কিউবা থেকে সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহারের (মেকানাইজড ইনফ্যান্ট্রি ইনস্ট্রাকশন ব্রিগেড) বিষয়ে আলোচনা করেন তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস বেকার। গর্বাচেভ তাকে আশ্বস্ত করেন কিউবা থেকে শেষ সোভিয়েত সৈন্যটিকেও ফিরিয়ে আনা হবে। এই সিদ্ধান্তের আগে আপনার সাথে কোনো পরামর্শ করেছে তারা?

পরামর্শ! তারা কখনোই আমার সাথে পরামর্শ করেনি। তখন তাদের পতন হচ্ছিল, ভেঙে টুকরো হচ্ছিল সোভিয়েত। আমাদের এখান থেকে যা-ই নিয়েছে, পরামর্শ ছাড়া নিয়েছে। অক্টোবর সংকটের সময় তারা পরামর্শ করেনি, বরং আমাদের অগোচরে চুক্তি করেছে ক্ষেপণাস্ত্র প্রত্যাহারের এবং সেই প্রত্যাহার পরিদর্শনে জাতিসংঘের প্রতিনিধি দলকে কিউবায় প্রবেশের বিষয়টিও চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করে! কিন্তু আমরা বলেছিলাম 'অসম্ভব'। কিউবায় কোনো পরিদর্শক প্রবেশের অনুমতি অন্তত আমরা দেবো না। যদি তোমরা কিউবা ত্যাগ করতে চাও, তাতে আমাদের কিছু আসে যায় না। অতএব তখনই তারা এই অভিনব পদ্ধতি উদ্ভাবন করে, সাগরে ভ্রাম্যমান অবস্থায় পরিদর্শন। উত্তেজনা সৃষ্টির জন্য এটাই যথেষ্ঠ ছিল। কিন্তু ইউএসএসআর তখনও বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি। এই বিষয়ে আমরা দীর্ঘসময় আলোচনা করতে পারতাম, অনেক ভুল-ভ্রান্তি হয়েছিল; অন্য উপলক্ষ্যে এসব বিষয়ে কথা বলেছি।

প্রসংগত আর একটি বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইবো। ১৯৯১ সালে সোভিয়েতরা যখন সেনা প্রত্যাহার করেছিল, সোভিয়েত ব্রিগেড...

'না'! তারা আমাদের পরামর্শ ব্যতিরেকে সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা করেছে। আমাদের মতামতের কোনো ধার ধারেনি। সবকিছু নিজেরা ঠিক করে নিয়েছে। ঐ ব্রিগেডের ব্যাপারে আলোচনারও কোনো প্রশ্ন নেই। এর পার্সোনেল এবং সরঞ্জাম উভয়ই ভঙ্গুর অবস্থায় পর্যবসিত হয়েছে। তাছাড়া সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন ভেঙে পড়ছে আর এই ব্রিগেড গঠিত হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতন্ত্রের সৈন্যদের নিয়ে। এখন তারা কিভাবে যুদ্ধ করবে? যদিও সোভিয়েত সৈন্যরা কারিগরিভাবে খুব দক্ষ ছিল, সাহসী ছিল এবং তার প্রমাণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রেখেছে তারা, তথাপি এই প্রত্যাহারের সময় ইউএসএসআর এর রাজনৈতিক অবস্থা ছিল টালমাটাল।

সেখানে কারো জন্য এমন প্রত্যাশা করা অর্বাচীন হতো না বোধকরি যে, কিউবা থেকে সোভিয়েত ব্রিগেড প্রত্যাহারের বিনিময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেও গুয়ান্তানামো থেকে প্রত্যাহারে বাধ্য করা যেতে পারতো?

আমার মনে হয় এটি সম্ভব হলেও হতে পারতো একমাত্র অক্টোবর সংকটের সময়। সামান্য আত্মসংবরণ আর ধৈর্য প্রদর্শনের মাধ্যমে খুব সহজে আমেরিকার কাছ থেকে এটি আদায় করে নেয়া যেতো, যেহেতু গোটা বিশ্বের মানুষ আমেরিকার খেয়ালিপনার জন্য একটি তৃতীয় এবং পারমাণবিক মহাযুদ্ধকে কোনো অবস্থাতেই আমন্ত্রণ জানাতো না।

বিশ্বযুদ্ধ?

আমরা পাঁচটি দাবী রাখলাম আলোচনার টেবিলে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল সাগরে জলদস্যু দিয়ে উৎপাত বন্ধ করা। আমাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসীমূলক কার্যকম এবং আগ্রাসী তৎপরতা বন্ধ করা, অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহার এবং স্বেচ্ছাচারী কায়দায় দখল করে রাখা গুয়ান্তানামো নৌ ঘাঁটি ফিরিয়ে দিতে হবে। খুব সহজেই এসব সুবিধা ছাড় করিয়ে নেয়া যেতো ওই নাটকীয় উত্তেজনার মধ্যে। বিশ্ববাসী একটি অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে, কিছু জলদস্যুর উৎপাতের কারণে কিংবা বেআইনিভাবে আরেকজনের নৌ ঘাঁটির দখলদারিত্বের মূল্যে নিশ্চয়ই একটি বিশ্বযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাওয়াকে স্বাগত জানাতো না। কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির উপস্থিতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের হাত মেলানোর পক্ষে শক্ত কারণ ছিল। কিন্তু এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এটিই যে, সত্যিকার একটি আগ্রাসন ঠেকাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ক্ষেপণাস্ত্র চাওয়ার এবং মোতায়েনের কোনো বেআইনি দিক নেই এবং সে ধরনের আগ্রাসী পরিকল্পনা যে করা হয়েছে তার প্রমাণ তো দিয়েছেই তারা। কেবল একটা ছুতার দরকার ছিল। মার্কিন ইতিহাসবেত্তাদের সংগ্রহে এই সংক্রান্ত সব কাগজপত্র আশা করি রয়েছে যা দিয়ে প্রমাণ করা সম্ভব যে, কিউবা আক্রমণের ছক তৈরি করেছিল আমেরিকা। সুতরাং যেসময় আমাদের নিরাপত্তার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের আলোচনা শুরু করেছে, সেসময় গিরনে পরাজিত মার্কিনীদের কিউবা আক্রমণের ছক কষা প্রায় শেষ। কিউবা আক্রমণের অযুহাত তৈরি হয়েছিল ১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারীতে। আর সোভিয়েত ক্ষেপণাস্ত্র কিউবায় পৌঁছায় জুনে।

১৯৬২'র গ্রীষ্মে?

হ্যাঁ, তাই। গ্রীষ্মে...কয়েক মাস পর। এটা সম্ভব যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন এর উল্লেখ করেছিল। কারণ মনে হচ্ছিল তাদের কাছে অনেক তথ্য রয়েছে...উভয় পরাশক্তিই পরষ্পরের উপর গুপ্তচরগিরি চালিয়ে আসছে বহু বছর ধরে। এসপিওনেজ বা গোয়েন্দা সূত্রে আমেরিকার আক্রমণের পরিকল্পনা সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষে টের পাওয়া অসম্ভব নয়। কিন্তু তারা যা জানে তা আমাদের সাথে ভাগ করেনি, বলেছে ভিয়েনায় ক্রুশ্চেভ ও কেনেডির মধ্যকার আলাপ থেকে অনুমান করেছে মাত্র। সোভিয়েতের সাথে আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র চুক্তির কোনো অবৈধতা ছিল না। যদি আপনি তুরস্কে বা ইটালিতে আমেরিকার জুপিটার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের উপরেও দৃষ্টি দেন, তাহলে আরো সহজে অনুধাবন করতে পারবেন। মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের পর কোনো দেশ ঐ দুই দেশে আক্রমণের কোনো হুমকি দিয়েছে বলে শুনিনি। অতএব কিউবা এবং সোভিয়েতের মধ্যে চুক্তির মূল সমস্যা এটি বৈধ ছিল কি অবৈধ তা নয়, বরং মূল সমস্যা ছিল উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে ক্রুশ্চেভের অযোগ্যতা বা অদক্ষতা। তিনি কিউবার সাথে তার দেশের একটি চুক্তির ন্যায্যতা এবং আইনগত বৈধতার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরার পরিবর্তে অস্ত্রগুলো রক্ষণাত্মক চরিত্রের কি আক্রমনাত্মক সেই বিতর্কে অবতীর্ণ হলেন। একটি রাজনৈতিক লড়াইয়ে কতগুলো চাতুরী, মিথ্যা এবং অর্ধ সত্যের আশ্রয় নিয়ে আপনি নৈতিক অবস্থান হারাতে পারেন না। আমি আবারো বলি এটি ছিলো সম্পূর্ন বৈধ, আইনগত এবং ন্যায়সঙ্গত। ভুলগুলো নিহিত ছিল সোভিয়েতের মিথ্যাচার এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপনার মধ্যে। কারণ সেটি কেনেডিকে সাহস সঞ্চয়ে সাহায্য করেছে। অন্যদিকে কেনেডির কাছে সত্যিকার প্রমাণ ছিল, যা তারা গুপ্তচর ইউ-টু বিমানের মাধ্যমে যোগার করেছে, হোক তা চুরি করে আনা। আমার প্রশ্ন হলো আপনি যদি ভূমি থেকে আকাশে উৎক্ষেপনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রই মোতায়েন করেছেন তাহলে শত্রুর গুপ্তচর বিমানকে কেন সুযোগ দেবেন আপনার উপর বেআইনি নজরদারির? গুপ্তচরবৃত্তি যেমন যুদ্ধ জয়ের বড় কৌশল যা শত্রু ব্যবহার করেছে সফলভাবে, তেমনই দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে না পারার মাশুল দিতে হয়েছে সোভিয়েতকে। আপনি যুক্তরাষ্ট্রকে কখনো এমন ভুল করতে দেখবেন না। এমনটি কল্পনাতেও ভাবা যায় না যে তুরস্ক বা ইটালিতে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির উপর দিয়ে সোভিয়েত গুপ্তচর বিমান উড়ছে আর নিচে মার্কিন সেনারা হাত গুটিয়ে বসে আছে। রাজনৈতিক এবং সামরিক ভুলের সংখ্যা এতোই বেশি যে, অন্য কোনো প্রসঙ্গে আলোচনার অবকাশই নেই। ১৯৬২ সালের অক্টোবরে ক্ষেপণাস্ত্র প্রত্যাহারে আমাদের সম্মতি ছিল - বিষয়টা ঠিক তা নয়, বরং প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ঠেকাতে কোনো ব্যবস্থা নিইনি, সেটিই মূখ্য। নিইনি তার কারণ, দুই পরাশক্তির সাথেই আমাদের কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছিল যা কিউবার মতো ছোটো দেশের পক্ষে অনেক বড়।

এটা অনেক বড় সমস্যা হতে পারতো?

দেশের পুরো নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে ছিল। অতএব যদি আমরা মনে করতাম যে, একটি ক্ষেপণাস্ত্রও আমাদের ইচ্ছের বাইরে এক ইঞ্চিও নড়বে না তাই করতে পারতাম। কিন্তু সেটা হতো, বলাবাহুল্য বড় আহাম্মুকি। আমরা যেটি করেছি তা হলো, পরিদর্শনের অনুমতি দেয়ার প্রস্তাব নাকচ। এর মাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়েছি, নিজেদের অসন্তোষ প্রকাশ করেছি, ঐ পাঁচটি সুবিধা ছাড় করানোর দাবী জানিয়েছি। কিন্তু এক্ষন সোভিয়েতগণ (আমি যেভাবে বলছি ঠিক সেভাবেই হয়েছিল) আমেরিকানদের সাথে রফায় এলেন। ওই নীতির মধ্যে, এমন কঠিন সময়েও তাদের মধ্যে সুপ্ত প্রেম জেগে উঠেছিল, একটা ঠান্ডা লড়াইয়ের মাঝখানে উষ্ণ প্রস্রবণ এর মতো প্রেমময়তায় বাধা পড়লেন তারা। রফা করলেন পরিদর্শন করতেই হবে, কিউবার মাটিতে সম্ভব না হলে জাহাজে ঘুরেফিরে হলেও। পরবর্তীকালে, ২০০১ এ রুশরা যখন ইলেকট্রনিক নিরীক্ষণ কেন্দ্রটি বন্ধ এবং গুটিয়ে নেয়ার ঘোষণা দিলেন, বোঝা গেলো এটা উপসংহার। তারা আমাদের অনুগ্রহ করে জানালেন সম্ভবত এটা ভেবে যে, আমরা অনুগামী হবো।

কিন্তু আপনারা সেই গুটিয়ে নেয়ারও বিপক্ষে ছিলেন?

আমরা মতানৈক্য প্রকাশ করি; কারণ ২০০০ সালের ডিসেম্বরে ভ্লাদিমির পুতিন যখন কিউবায় এলেন, তখন তার সাথে আমরাও ঐ কেন্দ্রটি পরিদর্শন করি হাভানার দক্ষিণে প্রকান্ড আয়তনের উপর দাঁড়িয়ে। পুতিন কিউবায় এসেছিলেন বন্ধুত্বের নিদর্শনস্বরূপ। কিন্তু কেন্দ্রের ভেতর আমি এক ধরনের ঘেটো আবিষ্কার করি। কারণ সেখানে বসবাসরত সোভিয়েতরা এক প্রকার বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করতো, স্ব-আরোপিত বিচ্ছিন্নতা। সুতরাং তাদের সন্তানদের জন্য কিছু কার্যক্রম তৈরি করি আমরা, এর মধ্যে সাংস্কৃতিক ও বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে পরিদর্শনের মতো সুযোগ অন্তর্ভুক্ত ছিল। সুতরাং, সেখানকার অবস্থা আমার জানা ছিল না। যখন ঘোষণা করা হলো যে, এটা বন্ধ এবং গুটিয়ে নেয়া হবে, তা ছিল একতরফা সিদ্ধান্ত। পুতিনের সফরের দশ মাস পর এই ঘোষণা দেয় তারা। অতএব এটা পরিষ্কার যে, কোনো ক্ষেত্রেই পূর্বালোচনার বা সমঝোতার কোনো অস্তিত্ব নেই।

তথাকথিত অক্টোবর সংকটের পরেও কেনেডির ব্যাপারে আপনার মনোভাব ইতিবাচক।

এই সংকট কেনেডিকে নতুন উচ্চতায় উঠানোর পাশাপাশি তার হাতে নতুন কর্তৃত্ব তুলে দিয়েছে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, এমন সংকটের মুখে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়ার যোগ্যতা বা সামর্থ্য তার ছিল। যদি আলোচনায় আমাদের অন্তর্ভূক্ত করা হতো, একটা গঠনমূলক সংলাপ শুরু হতে পারতো, আমাদের মধ্যে ভাব বিনিময় ঘটতো, দৃষ্টিভঙ্গির আদান-প্রদান হতো; এর ফলে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান অনেক সমস্যার অবসান ঘটতেও পারতো যার জের টানতে হয়েছে বহু বছর। কী ঘটেছিল না ঘটেছিল এসবের বাইরে শুধুমাত্র কেনেডির নীতির ভিত্তিতে তাকে মূল্যায়ন করতে হলে অবশ্যই সময়টাকে আমলে নিতে হবে। দেখতে হবে কী ধরনের মতবাদ তখন প্রচলিত ছিল এবং অবশ্যই একটা পরাশক্তির মাত্র ৯০ মাইলের মধ্যে অবস্থিত ছোট্ট একটি দেশের বিরুদ্ধে চালানো উৎপাতের প্রকৃতি কেমন হতে পারে; যারা নিজেদের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিল একেবারে একক প্রচেষ্টায়, কারণ সোভিয়েত আমাদের বিপ্লবের পেছনে না একটি পেনি আর না রাইফেলের একখানা গুলি সরবরাহ করেছিল। ১৯৫৯ সালের জানুয়ারীতে, একজন সোভিয়েত বা নেতাদের কাউকে আমি চিনতাম না।

আমার বিশ্বাস আপনার অনুজ রাউল কিছু সোভিয়েতকে চিনতে পারেন?

নিকোলাই লিওনভ নামের এক তরুণ সোভিয়েতের সাথে পরিচয় হয় রাউলের। ১৯৫৩ সালে ভিয়েনায় তরুণদের অধিকার সম্মন্ধীয় কী এক সম্মেলন শেষে একই নৌকায় ফিরছিল তারা। আগেই বলেছি, সমাজতন্ত্রি তরুণ দলের সদস্য ছিল রাউল। কী এক আশ্চর্য যোগসূত্র ছিল তাদের উভয়ের জন্য। তরুণের গন্তব্য ছিল মেক্সিকো, কূটনীতিক হিসেবে। তারা একই নৌকায় আসছিল, ব্যস এটুকুই। সে এখনও বেঁচে আছে। সমাজতন্ত্রিরা এখানে ক্লোনিং বা কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে আসেনি। এটা (সমাজতন্ত্র) এখানে খুব ভিন্ন প্রকৃতির ছিল। এবং কিউবাকে অন্য কোনো সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সাথে তুলনা করার আগে আপনাকে এটা মাথায় রাখতে হবে। বিশেষত পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোর সমাজতন্ত্র গড়ে তোলার সাথে তুলনা দেয়ার আগে, যারা এখন ব্যস্ত পুঁজিতন্ত্র গড়ে তোলায়। ঐতিহাসিক বিবর্তন সত্ত্বেও মানব সমাজের উন্নয়ন এবং এর উপর সর্বোচ্চ প্রভাব সৃষ্টিকারী বিষয়সমূহ, এমনকি মানব সমাজকে নির্দিষ্টকারী বিষয়সমূহের পাশাপাশি অন্তর্মুখী বিষয়ও রয়েছে যা অনেক ঘটনার নিয়ন্তা, ইতিহাসের গতিপথ নির্দেশ, ধীর কখনো বা বেগবান করে। কিউবার ক্ষেত্রে নি:সন্দেহে এটা প্রমাণিত যে, উদ্দেশ্যমূলক এবং অন্তর্মুখী বিষয়সমূহের একটি সম্মিলন এর বিপ্লব প্রক্রিয়ায় গতি সঞ্চার করেছে। এর সাথে সম্পর্কিত পরিবর্তন বা সংস্কারকে ত্বরান্বিত করেছে, যা প্রত্যেক ক্ষেত্রে (স্বার্থজড়িত বলে) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে কিউবাকে। ৬২'র অক্টোবর সংকটও এর বাইরে নয়। মার্কিনীরা যাকে 'কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকট' বলে আখ্যায়িত করেছে। কিন্তু ওই সময় কেনেডি নিজেকে যৌক্তিক প্রমাণ করতে চেয়েছেন - কোনো কিছুকে জটিল করে তোলার বিপক্ষে ছিলেন তিনি। তিনি গুপ্তচর সামরিক বিমানের উড্ডয়ন বাতিলের নির্দেশ দিয়েছেন, নিম্ন পর্যায়ের এসপিওনেজ বিমান এবং অপারেশন মঙ্গুজ স্থগিতেরও নির্দেশ দেন তিনি। এর ফলে বিপ্লব বিরোধীদের মধ্যে কেনেডি বিদ্বেষ আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে। কারণ তিনি অপারেশন প্লায়া গিরনে মার্সেনারিদের সহায়তায় নৌবহরকে হস্তক্ষেপের অনুমোদন দেননি এবং সর্বশেষ কিউবায় ক্ষেপণাস্ত্র সংকট তথা অক্টোবর সংকটের সময়ও আমাদের শত্রু এবং সমরপ্রিয় জেনারেল ও রাজনীতিকদের পরামর্শ মেনে কিউবা দখলের লোভনীয় সুযোগ হাতছাড়া করেছেন। তার গুপ্তহত্যার পেছনেও হয়তো তারাই। আমার কাছে কোনো প্রমাণ নেই, সবই অনুমান মাত্র। সন্দিহান হবার অনেক অনেক কারণ আছে।

কেনেডি যেদিন নিহত হন, ১৯৬৩ সালের ২২ নভেম্বর, লী হার্ভে অসওয়াল্ডকে এর জন্য দায়ী করা হয়। তাকে কিউবার প্রতি সহানুভূতিশীল বলে অভিহিত করা হয়। আপনার কি ধারণা তার গুপ্তহত্যায় কিউবাকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা এটি?

ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিতে হয় যে, কিউবায় কখনো এই লোককে ভ্রমনের অনুমতি দেইনি আমরা। যদি দিতাম তাহলে আর উপায় ছিল না, আমাদের বিরুদ্ধে প্রচারণার একটা হাতিয়ার তুলে দেয়া হতো তাদের হাতে, চমৎকার উস্কানী দেয়ার সুযোগ পেয়ে যেতো। আর যখন এই কান্ডে তদন্ত শুরু হয়, আমাদের পক্ষে সম্ভব সকল তথ্যই আমরা সরবরাহ করেছি।

এই হত্যাকান্ড নিয়ে সরকারী অবস্থানের ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী?

খুবই আশ্চর্যজনক। নিশানাভেদে যে নিপুণতা অর্জন করেছি সেই সুবাদে বলছি, আমি কল্পনাও করতে পারি না যে, টেলিস্কোপিক সাইট বিশিষ্ট একটি রাইফেল দিয়ে কেউ গুলি করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আবার লোড এবং গুলি করতে পারে। কারণটি খুব সহজবোধ্য, আপনি যদি এ ধরনের অর্থাৎ টেলিস্কোপিক সাইট বিশিষ্ট রাইফেল দিয়ে গুলি করতে যান এবং কোনো কারণে আপনাকে এক ইঞ্চিও নড়তে হয় তাহলে আপনার নিশানা আর আগের জায়গায় থাকবার কথা নয়। একটা উদাহরণ দিই, ধরুন একটি প্লেটকে আপনি নিশানা করেছেন ৫০০ বা ৬০০ মিটার নিচে, একবার গুলি ছোঁড়ার পর রিকয়েল করার জন্য বিরতি দিতে হবে, এরপর আবার আপনাকে নিশানা ঠিক করতে হবে। যদি আপনি একটি জানালায় বসে থাকেন এবং গুলি করেন, আপনাকে খুব জলদি রিলোড করতে হবে, খুব জলদি আপনার অবস্থান বদলাতে হবে, বন্দুক আবার ঠিকঠাক মতো তাক করতে হবে, এরপর নিশানা নিশ্চিত করে আবার গুলি করতে হবে। আর গতিশীল লক্ষ্যের ক্ষেত্রে কাজটি কতোটা কঠিন তা আপনি ভেবে বের করুন। অথচ সেখানে একাধারে তিনবার এবং নিখুঁত নিশানাভেদী গুলি করা হয়েছে; তা-ও এমন একজনের হাতে যে খুব একটা পাকা লোক বলে শুনিনি। খুব কঠিন।

তাহলে আপনি বলতে চাইছেন একজনের বেশি শ্যুটার সক্রিয় ছিল?

এই গোলাগুলির ব্যাপারে যেটি আমার মাথায় ঢুকে না তা হলো যে পদ্ধতিতে গুলি করা হয়েছে। আমি অন্য কোনো তত্ত্বও দাঁড় করাতে পারছি না। আপনি জানেন হয়তো, এ ব্যাপারে নানা মতবাদ রয়েছে। আমি যা বুঝেছি তা টেলিস্কোপিক সাইট বিশিষ্ট রাইফেলে ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা থেকে, অথচ সরকারী মতবাদ এটি মানতে নারাজ। ব্যাং ব্যাং ব্যাং। ব্যাপারটা এভাবে ঘটেছে! 

এই হত্যাকান্ডের ব্যাপারে দু'টো বিষয় আমার বোধগম্য নয়: 

এক, লক্ষ্যবস্তুতে একজন শ্যূটারের পরপর তিনবার নিখুঁত গুলি করার দক্ষতা এবং অবিশ্বাস্য দ্রুততার সাথে, যেটি বন্দুক ব্যবহারের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সাথে মেলাতে পারি না।

দ্বিতীয়ত: অসওয়াল্ড ছিল একজন কয়েদি, ছিল জেলে এবং হত্যাকান্ডের শোকে প্রায় মুহ্যমান অতি বদান্যশীল ও মহৎ প্রাণ জ্যাক রুবি পুলিশ এবং টিভি ক্যামেরাসহ সবকিছুর সামনে অসওয়াল্ডকে হত্যা করেছে। এমন ঘটনা বিশ্বের আর কোথাও ঘটেছে বলে আমার জানা নেই।

হত্যাকান্ডের ব্যাপারে সরকারী বক্তব্যে আপনি সন্দিহান?

অবশ্যই। যে কায়দায় অসওয়াল্ড ব্যাটাকে গুলি করা হয়েছে তা অগ্রহনযোগ্য। আর্থার শ্লেজিংগার বলে কেনেডির একসময়কার উপদেষ্টা (যিনি তখন থেকে কিউবায় অবস্থান করছেন) এর উপর ৯০০ পৃষ্ঠার একখানা বই লিখেছেন। তাতে তিনি খুঁটিনাটিসহ গল্পটি বলেছেন, কে হত্যা করেছে তা-ও। বেচারা অসওয়াল্ড কিউবায় আসতে চেয়েছিল বটে; কিন্তু তার উপর যেহেতু কিউবানদের আস্থা ছিল না, অতএব আমরা তাকে 'না' বলে দিই। ভেবে দেখুন একবার যে, অসওয়াল্ড অনুমতি পেয়ে কিউবায় এসে ক'দিন বাদে আবার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গেলো এবং কেনেডির হত্যাকান্ডে অংশ নিলো, এর প্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারতো? আমার তো মনে হয় শুধু কেনেডি নয়, কিউবার বিরুদ্ধেও একটা চক্রান্ত ছিল। আমার কাছে এই ব্যাপারে মার্কিন সরকারের অবস্থান অগ্রহনযোগ্য। শ্লেজিংগার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। হতে পারে অসওয়াল্ড একজন দু'মুখো এজেন্ট ছিল। আপনি ধারণা করতে পারেন সেটি কিভাবে সম্ভব হতে পারে...সে সোভিয়েত ইউনিয়নে গিয়েছে এবং ফিরেও এসেছে, সবাই জানে দু'মুখো এজেন্টরা কেমন হয়, ঠান্ডা লড়াইয়ের সময় উভয় পক্ষই উভয় পক্ষকে কড়া নজরদারিতে রাখতো।

সে তাহলে সোভিয়েত ইউনিয়নেও গিয়েছে?

হ্যাঁ, সেখানেই ছিল। এক সোভিয়েত মহিলাকে বিয়ে করে। পরে ফেরৎ আসে এবং বিবাহবিচ্ছেদ করে। শ্লেজিংগারের মতে তার আচরণের প্রায় ফ্রয়েডিয় বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। কিউবায় যখন আসতে চাচ্ছিল তখন এই লোক কী করছিল? এই মুল্লুকে পুলিশ স্টেশনে ঢুকে জ্যাক রুবি কী করে অসওয়াল্ডকে হত্যা করতে পারলো? এই দু'টো প্রশ্নই খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং সদুত্তরের দাবী রাখে এবং একটি ষড়যন্ত্রের প্রতি ইঙ্গিত করে অথবা মনে সংশয় উৎপন্ন করে। কিন্তু কোনো প্রমাণ হাজির করার ক্ষমতা নেই আমার, যা করতে পারি কেবল অনুমান। এই দু'টি প্রশ্ন উত্থাপন আর অসওয়ান্ডের অবিশ্বাস্য দ্রুততায় পরপর নিশানা ভেদের নিপুণতা আমাকে হতবাক করেছে।

Comments

Popular posts from this blog

চাড্ডিগণ [এক]

মুস্তারেবিন

বাম রঙ্গ [পর্ব-এক]